Saturday, December 7, 2019

বাজে গল্প ৪

অমিত্রসূদন বাবু বেডে শুয়েই হাঁসফাঁস করছিলেন। ডাক্তার অম্বুজাক্ষ তলাপাত্রের দুপুরের রাউন্ডের অপেক্ষাতে উৎসুক। ডাক্তারবাবু বেডের পাশে এসে দাঁড়াতেই জিজ্ঞাসা করলেন সেই প্রশ্নটা যেটা ভদ্রতা ও ভয় এর বশে করে উঠতে করতে পারেননি ভর্তি হওয়ার দিন থেকে। ডাক্তারবাবু বড়জোর একমিনিট সময় খরচ করেন রোগীপিছু রাউন্ডের সময়, বড় কোন সমস্যা না থাকলে, তাই ভনিতা কম রাখাই ভালো।

"কত সময় আছে আমার হাতে আর ডাক্তার তলাপাত্র"?

অম্বুজবাবু সকালের রিপোর্টের ওপর গম্ভীর মুখে দ্রুত চোখ বোলালেন, হেড নার্স মনসালতা মাইতিকে ডেকে খুব মৃদু স্বরে কিছু একটা দু-এক-কথা'র উপদেশ দিলেন।

"বললেন না যে ডাক্তারবাবু?" অমিত্র অস্থির।

দুপাশে অল্প একটু ঘাড় নেড়ে অম্বুজ বললেন "দশ"!

অমিত্র বিহ্বল হয়ে পড়লেন। "'দশ'??!! ছেলেকে নিউ জার্সি থেকে ডেকে পাঠাই তাহলে ডাক্তারবাবু?? ফিরিঙ্গি বে করেছে বলে মুখ দেখব না বলেছিলাম!" 

তারপরে বাস্তববুদ্ধি ফিরলে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, "ইয়ে, 'দশ' কি ডাক্তারবাবু? মাস? বছর তো নিশ্চই নয়? গড়পারের বাড়িটা বেচে দেব ভাবছিলাম, দাম পাচ্ছিলাম না, ভাবলাম বছর খানেক ধরে রাখি, অদ্দিন বোধহয়?? য়্যা??"

ডাক্তারের কালো হয়ে আসা মুখের দিকে তাকিয়ে আবার ভেবলে গেলেন অমিত্রসূদন। "তাহলে কি 'দিন' ডাক্তারবাবু? গিন্নি আজ মেয়ের বাড়ি গেছে মেয়ের ননদের আইবুড়ো ভাত-এ, বলে গেছে একটা দিন যেন না জ্বালিয়ে যেন ওর হাড়ে বাতাস লাগাই! একটা ফোন করি গিন্নিকে?"

কেবিনজোড়া নৈঃশব্দ্য। এবার নিয়তির হাতছানি ধরতে পারছেন অমিত্র। ফ্যাসফেসে গলায় শুধু জিজ্ঞাসা করতে পারলেন, "তবে কি ঘন্টা? য়্যা? ও মনসাদিদি, আজ রাতে আর ওই জ্যালজেলে স্যুপ নয়, একটু পেঁয়াজ রসুন দে' মাংস খাওয়াতে পারো? ও ডাক্তার? 'ঘন্টা'? বললে না যে?"

ঘরে ঢোকার মিনিটখানেকের মধ্যে গম্ভীর মুখে বেরিয়ে যেতে যেতে অম্বুজ বললেন "নয়"!

Wednesday, November 27, 2019

স্মৃতি

"কাকিমা, একটু চিনি দেবে? পরীক্ষার পড়া করতে রাত জাগার ব্যাপার আছে আমাদের তিনজনের, এদিকে এই রাত এগারোটায় দেখছি চা কফি করবার চিনিই নেই" ছায়াকাকিমা দরজা খুলতেই সোহম জিজ্ঞাসা করল।

সোহমরা তিনবন্ধু সস্তায় ভাড়ায় পেয়ে গেছিল কেষ্টপুর এর এই চারতলার ফ্ল্যাটটা মাসদুয়েক আগে। উল্টোদিকে শুধু ষাটোর্ধ্ব ছায়াদেবী, আর তার ক্যানসার আক্রান্ত স্বামী মনমোহন। সোহমরা তিনজনেই মফস্বল থেকে এসেছিল বলেই বোধহয়, মায়ের থেকেও বেশি বয়সী ছায়াকে দুম করে 'ছায়াকাকিমা' বানিয়ে ফেলতে সময় লাগেনি। ছায়াও ছেলের বয়সী এই তিনজনকে সামনে পেয়ে ভরসা পেয়েছিলেন, বাড়িতে অসুস্থ লোক, রাতবিরেতে যদি কখনো বিপদে পড়তে হয়। এদের মধ্যে সোহম সবথেকে মিশুকে বলেই, মনে হয় ওর সাথে যত গল্প ছায়ার, সোহমও বৃদ্ধাকে দেখে একটা মায়ায় পড়েছে, ওর গ্রামের বাড়িতে থাকা বুড়ি জ্যেঠিমাকে মনে পড়ে যায় ওনাকে দেখে। সোহম কোনদিনও বাড়িতে ঢোকেনি, কিন্তু যখনই দরজার বাইরে বা বাজারে দোকানে দেখা হয়েছে অন্ততঃ পাঁচ দশ মিনিট গল্প করেই ছেড়েছেন ছায়া। তবে ওঁর বাড়িতে বেল বাজানো এই প্রথম।

ঘরের ভেতরে খুব আবছা আলো। সোহম এর খারাপ লাগলো এটা ভেবে, ছায়াকাকিমা হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। যদিও ভদ্রমহিলা বলেছিলেন উনি রাত বারোটার আগে ঘুমোন না। মনমোহনকে দিনের শেষ ওষুধ রাত বারোটায় খাইয়ে তবে ওর ছুটি।

ছায়া ভেতর থেকেই সোহমকে বললেন, "আয়, তুই ভেতরে এসে বোস, আমি দিচ্ছি"।

সোহম ভেতরে ঢুকে এলো। ঘরে একটা ফ্যাকাশে হলুদ আলো। ছায়াকাকিমার মুখ অব্দি দেখা যাচ্ছে না এমন সে আলোর জোর। আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার, মেঝে জুড়ে ছড়ানো রয়েছে অনেক রকম জিনিসপত্র, এমনকি একটা ক্রিকেট ব্যাটও দেখলো সোহম।

"ঘর গোছাচ্ছিলে কাকিমা?"

ছায়া রান্নাঘরের দিকে যেতে গিয়ে আটকে গেলেন। একটু হেসে বললেন "না রে বাবা, ও আমার পাগলামি বলতে পারিস"।

"কিসের পাগলামি? বলো না!"

"তোর কাকু যবে থেকে এই মারণ রোগে ভুগছে তবে থেকে আমার খুব ভয় লাগতো জানিস?" ছায়া বললেন। "সর্বক্ষণ মনে হতো যেদিন ও ছেড়ে চলে যাবে সেদিন আমি কি করব? তিনকুলে তো কেউ নেই আমাদের"।

সোহম সেটা আগেই দেখেছে। এই দুমাসে কাউকে ওদের ঘরে আসতে দেখেনি। মনমোহন দরজা খুলে রেখে মাঝে মাঝে বাইরের ঘরের চেয়ারে এসে বসতেন, তাও বোধহয় গত দু সপ্তাহে সেটাও দেখা যায়নি একবারের জন্যেও।

ছায়া বলে চললেন। "তাই যে কাছের মানুষগুলো আগেই আমায় ছেড়ে চলে গেছে, তাদের স্মৃতিজড়ানো এক একটা জিনিস এই চোখের সামনে ফেলে রাখতে লাগলাম। যাতে করে এই চলে যাওয়াটা মানিয়ে নিতে পারি সময় হলে পরে"।

সোহম এর মন খারাপ হয়ে গেলো। সন্ধ্যে থেকে পড়ে পড়ে এমনিতেই মাথা ধরে গেছিলো, তাই বুড়িকে একটু কথা বলে সঙ্গ দিতে ইচ্ছে গেলো।

"ওইটা কি পড়ে আছে? চাইনিজ চেকার?"

ছায়া ফিক করে হেসে বললেন, "হ্যাঁ রে। আমার বাবা ছোটবেলায় খেলনা কিনে দেবার ঘোরতর বিরোধী ছিলেন। এইটা লুকিয়ে কিনে দিয়েছিল মা। লুকিয়ে চিলেকোঠার ট্রাংক এ ভরে রাখতাম। বিয়ের পরের দিন যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি, বাবা এইটা হাতে তুলে দিলো। বলল, মা, বাড়ির প্রাণটা তো নিয়েই যাচ্ছিস, আমার অপরাধবোধটাও নিয়ে যা।" একটু চুপ থেকে ছায়া বললেন, "জানিস? বাবা কোনদিন এত লম্বা কথা বলেননি আমার বা ভাইয়ের সাথে। খুব কড়া শাসন এ থাকতাম আমরা। এই কথার পরে আমার তো দু চোখ ভরা বন্যার জল"।

"তোমার ভাই আছে? এখন কোথায় থাকেন?" সোহম জিজ্ঞাসা করল।

ছায়া কিছুক্ষণ চুপ। তারপরে বললেন "বাবা চলে গেলো বিরানব্বই সালে, মা তার একমাসের মধ্যে ঠুনকো জ্বর এ, বাবলু তো বিয়ে টিয়ে করেনি, জন্ম বাউন্ডুলে, ধর্মতলার কোনো একটা ট্রাভেলস কোম্পানিতে লোকজনদের গ্রূপের সাথে ট্যুর অপারেটর হিসেবে যেতো এদিক ওদিক। মাঝে মাঝে আবার একা একাই বেরিয়ে পড়তো। হাতে কেবল ওই কালো ক্যাম্বিসের ব্যাগটা, ওই যেটা সোফার সামনে পড়ে আছে দেখ। দুহাজার তেরোতে হঠাৎ একদিন এসে বলল, 'দিদি, কেদারনাথ চললাম, একাই, এই ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়েছিলাম বাড়ি থেকে, তারপর মনে হলো হিমালয় এর কোলে স্বয়ং মহাদেব এর বাড়ি যাবো, ব্যাগ কিসের? এটা রাখ তোর কাছে, ফিরে এসে নেবো'খন'!"

ছায়া বলে চললেন, "সে ফেরা আর হলো না জানিস? মেঘ ভেঙে না কিভাবে যেনো বৃষ্টি নামলো কেদারনাথ এ, অনেক লোক তলিয়ে গেলো, ভাই আর ফিরলো না। তোর কাকু ওই খারাপ শরীর নিয়ে অনেকবার এ অফিস ও অফিস করেছেন খোঁজ মিলবার আশায়। জামাইবাবু খুব ভালোবাসতো তার উড়নচন্ডী সংসার না করা শালাকে। কিন্তু বাবলু আর ফিরলো না।"

সোহম এর মন আরো খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু ছেড়ে উঠে আসতেও মন দিলো না। নিতান্তই কথা চালিয়ে যেতে জিজ্ঞাসা করলো "আর ওই ব্যাট?"

"ও তো টুবলুর। টুবলু নিচের ফ্ল্যাটে এসেছিল বছর দুয়েক আগে। বছর আটেক বয়স। সারাক্ষণ দেখা হলেই বকবক বকবক। এই ব্যাটটা আমি কিনে দিয়েছিলাম। যদিও ওর সব খেলা ওর বা আমাদের ঘরের মধ্যেই। নীচে যেতে চাইত না খুব একটা। ওর মা'ই জোর করে পাঠাতো যাতে সবার সাথে মিশতে পারে। এইভাবেই এক বিকেলে নীচে খেলতে গিয়ে ফিরলো না ছেলেটা, বল কুড়োতে গিয়ে সোজা গাড়ির তলায়"। শিউরে উঠলেন ছায়া। "ওর বাবা-মা আর থাকেনি এই বাড়িতে, এখনো তালাই লাগানো আছে দেখবি"।

আর বসতে ইচ্ছে গেল না সোহম এর। মনটা ভারী হয়ে গেছে। কাল পরীক্ষা। বললো, "আছছা কাকিমা, পরে আসবো, রাত অনেক হলো, চিনিটা দাও"।

ছায়া দাঁড়িয়েই রইলেন। ঘরের ভেতর থেকে একটু একটু অস্পষ্ট কথাবার্তার শব্দ ভেসে আসছিল অনেকক্ষন। সোহম ভাবছিলো মনমোহন কাউকে ফোন করছেন হয়ত। সেই আওয়াজ আরেকটু যেনো বাড়লো। দুটো গলা? কেউ এসেছে নাকি, যাক গে, ওর কি, সোহম ভাবলো।

ছায়া হাতের আঙ্গুল তুলে ঘরের মেঝেয় পড়ে থাকা একটা চৌকো চ্যাপ্টা জিনিসের দিকে দেখিয়ে সোহমকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আর ঐটা কি বল তো?"

সোহমের আর এই খেলাটা ভালো লাগছিলো না। কিছু না বলে সোজা পড়ে থাকা জিনিসটা হাতে তুলে নিলো। দেখলো ওটা মনমোহন আর ছায়ার একটা পুরোনো ছবি, সম্ভবতঃ বিয়ের পরের, ফ্রেম করে রাখা আছে। জিজ্ঞাসু চোখে ছায়ার দিকে তাকাল সোহম, ছায়ার মুখের কাছটা বড্ড অন্ধকার।

ছায়ার গলার স্বর যেন অনেক দূর থেকে ভেসে এলো, "যতই ভেবেছিলাম এই সব করে চলে যাওয়াটা মানিয়ে নেব, পারলাম না রে, তোর কাকু আজ দুপুরে চিরদিনের জন্য চলে গেলেন, চোখে পুরো অন্ধকার নেমে এলো, ঘুমের বড়িগুলো সব একসাথে মুখে পুরে দিলাম, যখন ঘুম ভাঙলো, দেখলাম বাবলু শিয়র এ এসে বসে আছে, তোর কাকুর সাথে জমিয়ে গল্প করছে, এবারে সবাই একসাথে বেরিয়ে যাবো ভাবছি, যদিও তাড়া নেই কারোর, কারণ কোথায় যাবো তো জানা নেই, এমন সময় তুই বেল বাজালি"।

সোহম এর পা আর গলা যেন কেউ বেঁধে রেখেছে, তবুও সর্বশক্তি দিয়ে পেছনে হেঁটে দরজার বাইরে যাবার চেষ্টা করল, অন্ধকারটা যেন আরো বেড়েছে ঘরের মধ্যে, শুধু ছায়াকাকিমার শরীরের আশেপাশে আলোর ছিটে।

বেরিয়ে যেতে যেতে ছায়াকাকিমার গলা শুনলো শেষবারের মতো, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে, "চিনিটা তো নিয়ে যা বাবা, রান্নাঘরেই পেয়ে যাবি, সামনেই, এত রাত্রে আর ......"!

Friday, August 23, 2019

বাজে গল্প ৩

সুধন্য ঘোষাল ধেনো খেতে ভালোবাসতেন। বৌদির হোটেলের পেছনের দরজায় ব্লাডার থেকে সরাসরি গ্লাসে ঢালা বসিরহাট থেকে আমদানি করা ধেনো গলা দিয়ে নামতো যখন, সুধন্যর মনটা চুলকে উঠতো আনন্দে।

রোজকার মতো বিকেলে সেই দেবভোগ্য ধেনোতে চুমুক মেরে বুঁদ হয়ে গঙ্গার জলে পা ডুবিয়ে বসেছিলেন সুধন্য আর আকাশপাতাল ভাবছিলেন। পাড়ের মন্দিরটার চাকচিক্য ফিরেছে বছরখানেক হলো। জগন্নাথ পন্ডিত রাধাকেষ্ট নিয়ে বসে থাকতেন যে কালে, দু চারটে বুড়োবুড়ি আর সুধো মাতাল ছাড়া সে কেততন শোনার লোক পাওয়া যেতো না বড় একটা। এখন সে মন্দিরে বেশ বড়সড় বজ্রঙবলি, তার দ্বিধাবিভক্ত বুক এর মধ্যে হাসিমুখে শ্রীরামচন্দ্র ও সীতামাতা, সামনে বেশ কিছু ভক্ত আর টুংটাং করা দানবাক্স। জগু পন্ডিত বাতের ব্যাথায় নড়তে পারেন না। মুদিদোকানের শিউপুজনের ভাগ্নে রামশরন মিশির আজকাল বেশ দুলে দুলে হুংকার দিয়ে পুজো করে।

খানিকটা ঢুলুনি এসেছিল, ঠিক এমনসময় রামশরন এর বাজখাই গলার ডাক শুনে খোঁয়ারি চটকে গেলো সুধন্যর।

"সুধোকাকা! আবার খেয়েছো ওসব ছাইপাঁশ?"

সুধন্য ছোপ ধরা দাঁত বের করে বললেন "হেঁ হেঁ"!

"তোমায় বলেছি না, এসব ছাড়। সন্ধেবেলায় মন্দিরে এসে একটু বোসো। পুজোর কাজকম্মে একটু হেল্প টেল্প করে দাও। আমি যেদিন মিটিং এ যাই, লোকজন এসে ফিরে যায়। বলি, ব্রাহ্মণ মানুষ, একটু ধর্মকর্ম তো করতে পারো এই শেষ বয়সে এসে"।

সুধন্য আবার হেঁ হেঁ পূর্বক বললেন "সে ভাগ্নে কোনদিনই তো তেমন ..... হেঁ হেঁ"।

"ছ্যাঃ", রামশরন মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠলো "তোমাদের জন্য দেশটা টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিলো সত্তর বছর ধরে"!

সুধন্য মাথা নিচু করে স্বীকার করলেন। তারও আজকাল সবসময় মনে হয় দেশটা তার মতো লোকজনের জন্যেই ডুবে যাচ্ছে।

উদ্ধার করার শেষ মরিয়া চেষ্টা করল রামশরন। "বলো তো কাকা, বলো জয় শ্রীরাম, সব পাপ ধুয়ে মুছে যাবে"।

তিলমাত্র সময় না নিয়ে সুধন্য বললেন "জয় শ্রীরাম ভাগ্নে"! সুধন্য ধর্মতলায় বিফ ফেস্টিভ্যাল এ যোগ দেননা, বৌদির হোটেলের ঝাল ঝাল মুরগির কশা মাংসই তার কাছে যথেষ্ট। কানাঘুষো তিনি এটাও শুনেছেন জয় শ্রীরাম বললে কাটমানি দিতে হচ্ছে না আজকাল, যদিও তার কাটমানি দেবার মত কাজকারবার কিছুই নেই।

"এভাবে হবে না", শ্রীরাম এর জয়গানের মাত্রা সন্দেহজনক ঠেকলো রামশরন এর কাছে, "তোমায় আজ খুঁজে পাওয়াবো ভগবানকে"!

টানতে টানতে সুধন্য কে নদীর এক্কেবারে কিনারায় নিয়ে গেলো রামশরন। গলা ধরে ডুবিয়ে দিলো জলের মধ্যে মাথা। মন্দির থেকে লোকজন মজা দেখতে নদীর ধারে এসে জমেছে একে একে।

কলার খিমচে ধরে তুললো দু সেকেন্ড পরে। জিজ্ঞাসা করলো "পেলে রামচন্দ্রকে? মন যখন একদিকে যাবে তখনই পাওয়া যায় ভগবানকে"।

হাঁপাতে হাঁপাতে সুধন্য বললেন "না, ভাগ্নে"। গলার স্বরে যার পর নাই লজ্জা মিশে।

পাড় থেকে হা হা করে হেসে উঠলেন ভবতারন মুখুজ্জে। "তোর সমাজ সংস্কার আর হলো না ভাগ্নে"।

জেদের বশে আবার সুধন্যর মাথাটা ডুবিয়ে দিলো জলে রামশরন। এবারে অন্ততঃ পাঁচ ছ সেকেন্ড। হাত এ খামচে ধরেছে সুধন্য। আবার জল থেকে বার করে জিজ্ঞাসা করলো "পেলে রামচন্দ্রকে? না এখনও মন পড়ে আছে ওই ধেনোর ঠেকে?"।

সুধন্যর বুকের ভেতরটা হাপর এর মতো করে উঠছে। পাড় থেকে ভোলার পাঁচ বছরের যমজ ছেলেদুটো হাততালি দিয়ে উঠলো। আজ নতুন খেলা। সুধোদাদুকে ডোবানো। ফিশ ফিশ করে বলে উঠলেন সুধন্য "না রে ভাগ্নে, শুধুই অন্ধকার"!

অগ্নিশর্মা রামশরন প্রায় জলে ছুঁড়ে ফেলে মাথা চেপে ধরলো সুধন্যর। দশ সেকেন্ড। পনেরো সেকেন্ড। মজা দেখতে আসা জনতা একটু সংশয়ে, কিন্তু রামশরন এর মুখের ওপর আজকাল কথা বলে না কেউ। শেষে ভবতারনই বলে উঠলেন, "রামু, ভাগ্নে, ছেড়ে দাও ওকে, পাখির মতো শরীর, বাঁচবে না যে"!

ফোঁস ফোঁস করতে করতে সুধন্যকে গলা ধরে তুলে এনে ছাড়লো রামশরন। খাবি খাচ্চিলেন সুধন্য। একবার ধেনোতে হসপিটালের য়্যালকোহল মিশিয়ে খেতে গিয়ে ঠিক যেমনটা হয়েছিল। লাল চোখ নিয়ে অগ্নিশর্মা রামশরন জিজ্ঞাসা করে উঠলো সুধন্যকে "পেলে শালা? রামচন্দ্রকে? নাকি আবার ডোবাবো বোকাচোদা"?

সুধন্য মাটিতে শুয়ে শুয়েই প্রায় মাটির সাথে মিশে গেলেন লজ্জায়। পেট গুলিয়ে উঠছিলো। চোখে অন্ধকার। তাও ক্ষীণ কুন্ঠিত গলা অপরাধবোধে ডুবিয়ে শেষবারের মত জিজ্ঞাসা করে উঠলেন, "না ভাগ্নে, দেখলাম না, তুমি ঠিক জানো, এইখানেই ডুবে গেছিলেন উনি"?

অজ্ঞান হয়ে গেলেন সুধন্য।

Sunday, July 28, 2019

এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ ১

#এই_মৃত্যু_উপত্যকা_আমার_দেশ_১

জুন 2017: চাকরির প্রত্যাশায় আসা 16 বছরের নাবালিকা ধর্ষণ এর অভিযোগ জানায় উত্তরপ্রদেশ এর বিজেপি এম এল এ কুলদীপ সেনগার, তার ভাই ও সাঙ্গপাঙ্গদের ওপর।

জুন 2017 ~ এপ্রিল 2018: পুলিশ এফ আই আর নিতে অস্বীকার করে। কোর্টে কেস করা হয়। এবং লক্ষ্য লক্ষ্য কেস এর মতো এটাও চলতে থাকে।

3 এপ্রিল 2018: কোর্টে হিয়ারিং এ আসা মেয়েটির বাবাকে পেটায় বিধায়ক এর পরিবার। দুটি পুলিশ কম্প্ল্যান্ট হয়। একটি মেয়েটির বাবার ও একটি বিধায়ক এর পরিবারের তরফ থেকে। পুলিশ একটি অভিযোগ এর ওপরই ব্যবস্থা নেয় ও মেয়েটির বাবাকে গ্রেফতার করে ও জেল এ পাঠায়।

8 এপ্রিল 2018: মেয়েটি মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ এর বাড়ির বাইরে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহননের চেষ্টা করে।

9 এপ্রিল 2018: জেল থেকে মেয়েটির বাবাকে বমি, পেট ব্যাথা, পিঠ থাই পাছায় অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন ও সেপ্টিসেমিয়া নিয়ে হসপিটাল এ ভর্তি করা হয়, এবং, মেয়েটির বাবা মারা যান।

প্রথমে অসম্ভব তৎপরতার সাথে 6 জন ডাক্তারকে সাসপেন্ড করা হয় চিকিৎসাগত ত্রুটি প্রমান করার জন্য। চিকিৎসকেরা তীব্র প্রতিবাদ জানান ও উল্টো প্রমান রাখেন। এরপরে জনতা পথে নামে জানতে চেয়ে।

তখন, পরিস্থিতির চাপ এ 6 পুলিশকর্মী সাসপেন্ড হন।

পুলিশ বিধায়কের এক সহকারীকে গ্রেফতার করে।

10 এপ্রিল 2018: পোস্টমর্টেম রিপোর্টে জানা যায় মেয়েটির বাবার শরীরে অজস্র আঘাতের চিহ্নর কথা।

11~12 এপ্রিল 2018: সিবিআই দায়িত্ব নেয় কেস এর। চার্জশিট এ অবশেষে কুলদীপ সেনগার এর নাম আসে। জেল এ যান কুলদীপ ও তার ভাই, কেস চলতে থাকে, চলতে থাকে।

.........................

.........................

কিন্তু এ তো ঠিক মনোমত শেষ লাগছে না, তাই না?

সেজন্য অবশেষে এসেছে 28 জুলাই 2019। লইয়ার আর আত্মীয়ার সাথে লখনৌ এর দিকে চলতে থাকা মেয়েটির গাড়িকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরেছে ট্রাক। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হসপিটাল এ ভর্তি সে।

এইবার চেনা চেনা লাগছে না? উপসংহার?

আসুন, অনেক হলো, মেয়েটিকে মেরে ফেলি এবারে। জেলবন্দি নেতাদের বের করে আনা খুব দরকার। আমাদের রকেট আবার চাঁদে গেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এই চন্দ্রযান ২ প্রমাণ করে আমরা ভুল সংশোধন করে ফিরে আসবার শক্তি রাখি।

ভুল হয়ে গেছে কুলদীপ সেনগার এর সাথে। আসুন, সংশোধন করি।

😶

Thursday, April 4, 2019

গুপি গাইন বাঘা বাইন

স্নেহের বাবু,

তোমার গল্প শোনাবার আবদারে আড়ষ্ট হয়ে যেতে দেখে বাবার ওপর হয়ত রাগ হয় তোমার। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার রাপুনজেল বা সিন্ডারেলার গল্প বাবা খুব একটা সহ্য করতে পারে না কোনকালেই, এক পাতা দক্ষিণারঞ্জনও মন থেকে পড়েনি বাবা এমনকি ছোটবেলাতেও।

তা বলে রূপকথা কি পছন্দ নয় বাবার? সেরকম নয়। ঠিক যে সুন্দর গল্পটা ছেলেভুলানো গল্পের ছলে বলতে বলতে তোমার মধ্যে গল্প ছাড়াও ছোটবেলা থেকে বড়, সত্যিকারের বড় হয়ে ওঠার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে, ঠিক যেমন করে তোমার দাদু ঢুকিয়ে দিয়েছিল তোমার বাবার মধ্যে, প্রথম সরকারিভাবে সিনেমা দেখার অনুমতি দিয়ে, ক্লাস টু তে গুগাবাবা দেখতে দিয়ে, সেরকম গল্প বলতে পারলে বাবা ধন্য হয়ে যাবে। কিন্তু সে গল্প বলবার ক্ষমতা আর কজনই বা রাখে।

কোনদিন যদি তুমি আমার আগ্রহ নিয়ে এই সিনেমা দেখতে শেখো, রাজা, রাজকন্যা, ভূত, বর, গানবাজনা এসব এর পরিধি পেরিয়ে, বলতে শেখো এমন এক ভাষা, যেখানে "উঁচা নীচা ছোট বড় সমান", জানবে বাবা গল্প বলতে না পারলেও, ঠিক এইটুকু হোক তা চেয়েছিল।

রাজ্যের প্রজা ঝাঁঝিয়ে উঠে যখন জবাব দেয় "যে রাজা খেতে দেয় না, তারে আবার খাজনা দেয়া কি?", ভুখা পেটের সিপাহী খাওয়ার কথা তুললে মুখে খাবার ঠাসা মন্ত্রীমশাই যখন বলে ওঠেন "আজ বাদে কাল যুদ্ধ হবে, তোমাদের এত খাইখাই কেন বলতো?", ঠিক তখন রাজার প্রিয়পাত্র না হতে চেয়ে যদি তোমার বিরুদ্ধ মত সবার সামনে নির্ভয়ে রাখতে পারো, জানবে সবথেকে প্রিয় গল্পটা বাবা তোমাকে বলে ফেলেছে এক লম্বা মহীরুহের ক্যামেরা দিয়ে।

রাজার যুদ্ধের অশ্লীল গান আর নাচে সায় না দিলে যখন জল্লাদ ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে, তখনও যদি একদল সৈন্যের সামনে তপেনসুলভ সারল্য অথচ দৃঢ়তার সাথে বলতে পারো "রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে দ্বন্দ্বে অমঙ্গল", জানবে এই গল্পটা তোমাকে বাবা বলে যায়নি, কিন্তু চেয়েছে তুমি জানো সেই মহান মানুষটির সৃষ্টি থেকে। জানবে বাবার গল্পেও সেই কথাই থাকত, যে যুদ্ধ নয়, পেটের খাবারই প্রাথমিক প্রয়োজন, আর সে খাবার না পেলে বড় বড় যুদ্ধবাজদের পরিকল্পনা, এমনকি সাধারণ মানুষেও ভেস্তে দিতে পারে।

এমনকি বাবা চেয়েছিল, তুমি যখন এ গল্প দেখে আর মনে নিয়ে বড় হয়ে উঠবে, তখনো যেন এই গল্প তোমাকে নিস্তার না দেয়। বড় হবার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ দুঃখ আসবে, এলে মনের ভেতর গুনগুন কোরো, "যার ভান্ডারে রাশি রাশি, সোনা দানা ঠাসা ঠাসি, যেনো দুঃখ তারও হয়"। আরো বেশি মন খারাপ যখন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধবে সিংহাসন বা বড় দায়িত্বে বসা তোমাকে, জানবে রাস্তা দেখানো আছে ওই একই গানে, "দুঃখ কিসে যায়, প্রাসাদেতে বন্দী রওয়া বড় দায়, একবার ত্যাজিয়ে সোনার গদি, রাজা মাঠে নেমে যদি হওয়া খায়, রাজা শান্তি পায়"।

তাই বাবা অপেক্ষা করছে, কখন সেই সর্বাপেক্ষা রূপসী রূপকথা তোমার নজরে আসে আর মনে গেঁথে যায়।

এইটুকুই।

তোমার বাবা।

Monday, February 25, 2019

দেশদ্রোহী

"যুদ্ধ নয়? শান্তি চাই?? শান্তি!!! শালা নিজেকে বাঙালি বলতে লজ্জা করে না আপনার? জানেন, এই বাংলার থেকে ক্ষুদিরাম বোম মেরে ফাঁসিকাঠে গেছে? নেতাজির ভয়ে ইংরেজ এর হৃৎকম্প উঠেছে? রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি লাথি মেরেছেন?"

হ্যাঁ, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই উগ্র দেশপ্রেম থেকে সাবধানও করেছেন বারেবারে সেটা তো মানেন?

"কি বলছেন মশায়? রবীন্দ্রনাথ এর থেকে বড় দেশপ্রেমী আর আছেন নাকি? রবীন্দ্রনাথ প্রথম বঙ্গভঙ্গ রুখেছিলেন, দ্বিতীয়টা আর রোখা যায়নি, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ কলকতাটা পাকিস্তানে যাওয়া থেকে আটকেছিলেন, হোয়াটসয়াপ এ পেয়েছেন নিশ্চই?"

ইয়ে, আপনি চার অধ্যায় পড়েছেন? এক দেশপ্রেমিক বিপলবী দলের নেতা মাষ্টারমশাই কখনো দলের মোহে এক মহিলাকে দলের মধ্যমনি বানিয়ে রাখেন ছেলেদেরকে দলে আটকে রাখতে, আবার তাকেই সরিয়ে দেবার জন্য হাত কাঁপে না তার যখন সে মেয়ে ভালোবেসে ফেলে দলের সেরা ছেলেটিকে? পড়েছেন?

"কি বলছেন মাইরি? এ সব লিখেছে দাড়িবুড়ো?"

লিখেছেন তো! আর ঘরে বাইরে? যেখানে জমিদার নিখিলেশ স্বদেশী দলের নেতা সন্দীপকে বলছেন, স্বদেশী যদি তার জমিদারির গরিব লোকেদের, যার অধিকাংশই গরিব মুসলমান, রুটিরুজিতে টান ফেলে তবে সেই স্বদেশী তিনি হতে দেবেন না?

"য়াঁ! ইল্লি! আবার মুসলমান? শালা একা নেহেরুতে রক্ষা নেই শালা শিলাইদহের অত্যাচারী জমিদারটা দোসর ছিল বলছেন??!! শালা এই সব লিখে মালটা আশি অব্দি বেঁচে গেলো? বাংলাটা শালা আপনার মতোই বিনা শিরদাঁড়া মালে ভর্তি, একটা নাথুরাম জন্মায় না শালা।
যাই হোক, একটু ধন্যবাদ আপনারও প্রাপ্য। আমি আবার একটু শিক্ষাফিক্ষা নিয়ে থাকি বুঝলেন? দু চারটে স্কুলের ম্যানেজমেন্ট এ আছি। নিজেরও একটা স্কুল খুলছি এ বছরই, নাম দিচ্ছিলাম আরেকটু হলে 'রবীন্দ্র বিদ্যালয়', লাইসেন্স ও চলে এসেছে ওই নামে।"

তাহলে এবারে কি করবেন?

"দাদা, ওই দেশদ্রোহীর ভাবনা তো রাখা সম্ভব হবে না স্কুলে। সহজপাঠ টহজপাঠ এক্কেরে বাদ।কিষেনজির কথা বা কথাঞ্জলি রাখব সিলেবাসে তাও ভালো।"

আর স্কুলের নামটা?

"ভেবে নিলাম এক্ষুনি। পুরোনোটা না বদলে একটা শব্দ গুঁজে দেব। এখনই বলছি না। আপনার ঠিকানাটা দিন একটা হ্যান্ডবিল আপনাকেও পাঠিয়ে দেবখন। হাজার হোক আপনার শ্বশুরবাড়ির এলাকা, দু-একখান ছাত্র আপনিও, মানে, হেঁ হেঁ"।

.
.
.

আজ সকালের ডাকে এসেছে।

হ্যান্ডবিল।

ছবি রইল।