যাই হোক, শোন, তুমি নিজে রাজশেখর ঝেড়ে সংলাপ বলছ, আমায় চুলকিও না।
আচ্চা বল, তিনটে প্রশ্ন করব মাত্র।
বলতো, আলস্য কি?
মাঝরাতের মনখারাপি ছায়াছায়া অবনীশ এর বিছানার চারপাশে।
আলোআঁধারির ভয়ে গলা থেকে না বেরনো গোঙানি ঘামেভেজা ঘুমভাঙানিয়া।
উঠে ভাবা, পুরোটাই স্বপ্ন?
স্বপ্ন না হলে কি হবে সেই ভয় এ আলো জ্বালিয়ে ঘুমের চেষ্টা।
না ঘুমে দাঁড়িয়ে উঠে জলের জায়গাটার খোঁজে বসবার ঘর।
পা এর জোর হঠাৎ করে কমে আসা।
দাঁড়াতে পারবে তো আর, আজ রাত্রে, আচ্ছা, অন্ততঃ কাল সকালে?
আই সি ইউ এর বাইরের ডেটলের গন্ধটার মত ভয় ধরানো ভাবনা।
শরীরের ভেতরে একটা শিরশির করা আঁচড়।
অজান্তে হাত খুঁজে চলে অবলম্বন।
নীরবতা, নিরুপায় বসে পড়া।
বুকটা হঠাৎ করে খালি, বাদ পড়ল কোন একটা দরকারি স্পন্দন?
নাকি সেরকম কিছু নয়, ওষুধ বাদ পড়ল কোনোটা?
থাক এখনের ভাবনা, তাহলে কি ভাবা যায়?
দায়িত্বর বোঝার ওপর অভিমান এর শাকের আঁটির চিত্রনাট্য?
'দ্রোন, ভীষ্ম, কৃপরা ধর্মপক্ষ ছাড়লে লড়াই তো অনিবার্য'।
'কিসের ধর্মপক্ষ? রূপান্তরকামীর ঢাল, পুত্রমৃত্যুর মিথ্যা, দেবতার নামে কবচকুন্ডল চুরি, উরুতে নিয়মভাঙা গদাঘাত?'
থাক এসব বরং। তাহলে?
চুন খসে পড়ার ফলাফল শানিত কথার ছুরির ফালাফালা করে দেওয়া হতাশার সংলাপ?
'যা করছি সব তোমাদের জন্য'।
'পাপের ভাগ তো নিতে পারব না, হোক না সে পাপে দায়িত্বপালন'।
এরপরে রত্নাকরও হতাশা কাটাতে আঁকিবুঁকি কাটতেন না?
কিন্তু তা তো ক্রমে হয়ে উঠেছিল সময় উত্তীর্ণ ক্যানভাস, এরকম না পাঠানো চিঠি নয়।
এদিকে প্রানপনে সরাতে পারা যাচচ্ছে না বোধহয় জঞ্জালগুলো।
দম্ভ ভরে 'কেন যাব ... সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাব' বলা লাইনগুলো এ প্রজন্মে ফেসবুক গ্রূপে আর লিটিল ম্যাগ এর পাতায় বন্দী।
খবরে জানিয়েছিল সেদিন, আজকাল নাকি স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারও ভর্তি মানুষের উচ্চাশার টুকরোতে।
ঠিক কি ছিল চাওয়াগুলো?
একরাতের মত ভুলতে চাওয়া সামনের মাসে মাইনে সময়মতো না হবার ভয় পাওয়া?
না বোধহয়।
কিছু দিনের জন্য পেতে চাওয়া নিজের একফালি বন্ধকীবিহীন জমি, একটা কোনার ঘর, এক আলমারি বই, একটা টিভিতে রূপকথার আলোআঁধারী, সিনেমাহলের অন্ধ্কার পর্দায় মধ্যমেধার বেড়া পেরোনো দু একটা ক্লাসিক?
মনে পড়ে না।
চোখ ঝাপসা হয়ে আসা আগে ছিল লজ্জার, কখনো গর্বের।
এখন, দুর্বলতার, নীরবতার।
চল্লিশ এসে গেল অবনীশ এর।
একটা বুড়ো থুত্থুড়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে।
হাত বাড়াবে, চড়ে ধুঁকতে ধুঁকতে সময় পেরনোর জন্যে।
কি হবে যদি ধরে নেবার আগে 'রাজা' আগে আসেন অবনীশ এর পাড়ায় যেমন এসেছিলেন অমলের জন্য?
দরবার এর মেহ্ফিল এ শ্রোতা চেয়ে বসেন?
সেই দরবার, যে দরবারে বিশু পাগল নন্দিনীর হাত ধরে আসে অকুতোভয় এ, খোঁপায় গুঁজে দেয় রক্তকরবীর গোছা, অন্তুকে মাস্টারমশায়ের ভয় পেতে হয় না মনখারাপের এলাকে কাঁধ পেতে দিতে, নিখিলেশ সন্দীপকে ক্ষমা করে দিতে পারে, শ্রীকান্ত কমললতার কাছে বসে দু কলি গান শুনতে পারে, হেরম্ব দিবারাত্রির কাব্য সাঙ্গ করে সংসার বসাতে পারে, শিবরামবাবু কে খাবারের ভাবনা ভাবতে ভাবতে জোর করে লিখতে হয় না হয় না থোড় বড়ি খাড়া বরং হাত দিতে পারেন পৃথিবী ভালোবাসা আর ঈশ্বরে, এরকম আরো কত কিছু।
মাঝরাতের এফ এম এ সুমনের গলায় পুরনো গানে সেই ধ্রুবসত্যি।
'এখানে জীবন মানেই মৃত্যু, যন্ত্রনা গিলে ফেলা'।
অনেকদিন আগের কথা বলে মনে হয়, একটা সময় ছিল যখন সুমন ছোট্ট পাপড়ি দে কে নিয়ে গান লিখতে পারতেন।
রাতের প্রায় শেষ, শব্দ খোঁজা শেষ, কোথায় ঘুমের দেশ?
অবনীশ জানে না।
ওর জন্য করুনা নয়।
প্রার্থনা থাক।
"আপনি কখনো বোঝাতেন ওকে? ভূত বলে কিছু হয় না? পুরোটাই আমাদের মনের দুর্বলতা, অবসাদ বা একাকীত্ব?"
না, এত তত্ত্বকথা বোঝানর সুযোগ পাইনি কখনো। ও ছোট থাকতেই আমি বাইরে বাইরে। মায়েরই বেশি ন্যাওটা। তবে ওর মা কিন্তু এসবে বিশ্বাস করে না। সেসব দিক থেকে অনেক শক্ত মনের, একার জোরেই সবকিছু সামলেছে জীবনের। আজও আমাকে খুব একটা পাত্তা দেয় না।
"তাহলে তো মা-রই উচিত নয় কি ওকে বোঝান? 19 বছর বয়সে এসে রাত্রে টিউবলাইট জ্বেলে ঘুমান বোধহয় খুব ভাল একটা অভ্যাস নয়?"
আমিও তাই মানি। চেষ্টা করি ওর মাকেও জানানোর। ছেলেটা তো লজ্জায় ওর এই ভয় এর কথাটা মাকে বলতে পারে না। আমাকেও বলত না। কিন্তু আমি জানি, আমারই ছেলে তো। অথচ ওর মা আজকাল আমাকে এড়িয়ে চলে একেবারেই। অফিস থেকে ফিরে যখন ক্লান্ত হয়ে শুয়ে থাকে বালিশে মুখ গুঁজে, পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। জিজ্ঞাসা করি, 'অনি কেমন আছে খোঁজ নিয়েছ?' আমার মনে হয় ছেলেটা রাত্রে একলা ঘুমোতে পারছে না অনেকদিন হল। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
"কিন্তু আমাকে এসব বলছেন কেন? আপনার ছেলে মাঝরাতে উঠে বালিশের পাশে বসে থাকা অশরীরী উপস্থিতি অনুভব করে মন খারাপের রাতে। সে তো বুঝলাম। এতে আমি এই বয়সে আর এ হেন অবস্থায় ওর কি উপকারটা করব?"
না, আপনি কিছুদিন আগে পর্যন্তও এই ধরনের অবসাদের রুগীদের ভগবান ছিলেন। আমাকেও তো কতবার ফিরিয়ে এনেছেন নিশ্চিত হারের দোর গোড়া থেকে।
"ভুলে যাচছেন আমি রোগীর চিকিৎসা করতাম। আজকের মতো রোগের মুখোমুখি বসতাম না। অনেকদিন তো হল আমাদের ঐ জগৎ ছেড়ে আসা। আমার বয়স আর আপনার অবসাদ তো আমাদের পৃথিবীবাস সংক্ষিপ্ত করেই ফেলেছে। রাত্রেবেলা ওর মন খারাপ হলে পাশে গিয়ে বসে মাথায় হাত বোলান ছেড়ে দিন না। মন খারাপ লড়তে শিখে যাবে ও, লড়াকু মায়ের ছেলে কিনা, মৃত বাবার অশরীরী ছোঁয়া কিন্তু ভুলতে পারবে না, সারা জীবন আলো জ্বেলেই ঘুমোবে, বা জাগবে!"
6 মাস আগে:
বাবু, আমরা একটা নতুন স্কুলে যাব, ওখানে তোমার সামনে আন্টিরা বসে থাকবে, তোমায় যা যা জিজ্ঞাসা করবে সব বলবে কিন্তু। একটা রাইমস বলতে বললে কি বলবে?
বাবু: "টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার"
বাবুর বাবা পরিতৃপ্তির সাথে ফেসবুকের খুটখুটে মন দেন। মা আলতো করে গা এলিয়ে দেন বিছানায়।
3 মাস আগে:
বাবু নতুন স্কুলটায় যখন যাব সব উত্তর দেবে কিন্তু। রাইমস বলতে বললে কি বলবে?
বাবু: "থ্যাঙ্ক ইউ গড ফর ওয়ার্ল্ড সো ...."
বাবা ভাবেন এই না হলে রক্তের স্রোত? ফ্যামিলির বাঘের বিলিতি বাচ্চা। মাম্মাম হাসিমুখে বিবার ওয়েবসাইট থেকে একটা চুড়িদার এর অর্ডার শুরু করেন।
এক সপ্তাহ আগে:
বাবু, নতুন স্কুলে যদি রাইমস ....
বাবু: "মেরি হ্যাড এ লিটল ল্যাম্ব"
বাবা বলেন, এ তো বাবুকে একটা রাইমস বলতে বলা আন্ডারেস্টিমেট হয়ে যাবে গিন্নি, দু চারটে হলে নাহয় একটা কথা। মা মৃদু কেমন দিলাম হেসে একটা নতুন কেনা লোরিয়াল এর লোশন ট্রাই করতে থাকেন আয়নার দিকে তাকিয়ে।
আগের দিন:
বাবু, তাহলে রাইমস কোনটা দিয়ে শুরু করছ?
বাবু, খানিকক্ষণ ভেবে, একটা প্রেগন্যান্ট পজের সাথে: "আদুড় বাদুড় চালতা বাদুড়"
বাবা একটা দক্ষিনারঞ্জন মিত্র মজুমদার হেঁচকি তোলেন। মা, আজন্ম দুধের সরবিদ্বেষী, একটা চামচে দিয়ে চা থেকে সর তুলে ফেলতে গিয়ে সর ভর্তি চামচ পাঠিয়ে দেন নিজের মুখে। ঘরে ইতি গজ পরবর্তী দ্রোনাচার্য্ মুহূর্ত নেমে আসে। ট্যাশ স্কুলের রঙিন ভবিষ্যৎ ছবির সামনে একটা কালো খেষ্টে বাদুড় (বোধহয় ক্লাসিফিকেশন অনুযায়ী চালতা বাদুড়ই হবে) চা চা চা নাচতে নাচতে বাবা মা'র দিকে এগিয়ে আসছে।
চাইল্ড সাইকোলজির ফেসবুক আপডেট বলছে 'বাচ্চাকে কোন কিছু বারণ করবেন না, আরো বেশি করবে, বরং প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিন'। সামান্য দু মিনিট (দু ঘন্টার বেশি উৎকণ্ঠাময়) শ্মশানসুলভ নিস্তব্ধতার মধ্যে নিজের সম্বিৎ ফিরিয়ে বাবা জিজ্ঞাসা করেন, "আছছা, আর যদি গান গাইতে বলে"?
বাবু মুখ নামিয়ে একটা বেগুনের ছবিতে গেরুয়া রঙ করতে থাকে। মা রাশ হাতে নেবার চেষ্টা করেন। "বাবু, যদি গান ....."?
বাবু তাকায়। বাঙময় চোখ। বাবার আশায় ভরে ওঠা চোখ আর মায়ের ব্যাকুল মুখের দিকে তাকিয়ে সুর করে বলে:
"আদুড় বাদুড় চালতা বাদুড়"।
নিদ্রাহীন রাত্রি। বাবা ভাবেন সরস্বতী পুজোর আগে লুকিয়ে কুল খাবার পাপ। ঘরের নিরামিষ বৃহস্পতিবারে মাকে দিয়ে জোর করে ডিম ভাজা রাঁধাবার পাপ। বৌকে বুঝতে না দিয়ে মলের ভেতরে ছোট পোশাকের মহিলাকে আড়চোখে মেপে নেবার পাপ। আচ্চা, রৌরব নরকে শ্যাওড়া গাছে বোধহয় চালতা বাদুড় ই থাকে?
ওদিকে মা ভেবে চলেন। কালো বর নিয়ে মনের ভিতর খুঁতখুঁতে ভাব ধরে ফেললেন ভগবান? পুজোয় মার্কেটিং নিয়ে বেশি দাবি রেখে ফেলেছেন কখন? বাপের বাড়িতে নিজের মাকে বাবুর মাছের ঝোলের ঝাল নিয়ে বেশি চোপা করা হয়ে গেছিল গত পুজোয়? ঘাড়ের কাছটায় একটা অস্বস্তি, একটা চালতা বাদুড় ফরফর করছে যেন।
ইন্টারভিউ এর দিন:
এটা কিসের ছবি জান?
"বার্থডে পার্টি"
বাহঃ। বার্থডে পার্টিতে কি গান গাওয়া হয় বাবু?
বাবা চেষ্টা করেন মাটির সাথে মিশে যেতে। সীতা কে মনে পড়ে বাবার। বাবার ধারণা একটা চালতা বাদুড় (সেটা যাই হোক না কেন) ও নিজের জন্মদিনে "আদুড় বাদুড় চালতা বাদুড়" গান শুনতে রাজি হবে না। মা ও বেরনোর রাস্তাটার দিকে তাকাতে থাকেন, ভাবেন মিউনিসিপ্যালিটির স্কুলে পড়লে মিড ডে মিল পাবে মেয়ে, সেটাই বা কম কিসের এই ট্যাশ স্কুলের চাইতে (শিয়াল ও দ্রাক্ষাফল দ্রষ্টব্য)।
বাবু সেই পজ টা নেয় আবার। সুর করে গেয়ে ওঠে ...
....
.....
.....
"হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ"।
(পুনশ্চঃ: এই গল্পের সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক।
ও, আর বাবু বাবা মা এর রুটিন স্বপ্ন মেনে নিজের জোরে সুযোগ পেয়েছে ট্যাশ স্কুলে। এখন নিশচিন্ত বাবা মা, যতদিন না আবার চালতা বাদুড় টা উড়ে আসে, নাকি ফিরে এলেই রুটিন ভাঙবে বাবু? নিজের রাস্তা নিজে তৈরি করতে শিখবে? জবাব ভবিষ্যৎ এর গর্ভে)
ওদিকে:
- যখন পাঁচজন 'ছোটলোক' মানুষ মুক্তি পেয়েছেন তীব্র বিকাশমুখী গোহিতৈষী সরকার বাহাদুর এর দেয় ন্যায্যমূল্যস্বরূপ বুকে সামান্য গরম ধাতুর টুকরো ধারণ করে, সারাজীবনের মতো, বৃষ্টির চিন্তা, বীজের চিন্তা, দাম পাবার চিন্তা থেকে!
- যখন সেই পাঁচজনের সাথে একই গাড়িতে গাদাগাদি করে নরকের উদ্দেশ্যে যাবার জন্য শেষ মুহূর্তে উঠে পড়েছে একটা খিলখিলানো বাচ্চা যাকে অটো থেকে ছুঁড়ে ফেলে মাথাটা থেঁতলে দিয়ে গণভোগে অরাজি মাকে শিক্ষা দেয়া গেছিল! যার শবদেহ কোলে করে বিবস্ত্রা মা প্রগতির প্রতীক মেট্রোতে চড়ে সরকারি হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন চিরঘুম ভাঙাতে (বলিহারী শখ)!
- যখন এক ভাঁড় যুবরাজ গাল ফুলিয়ে বি গ্রেড নাটক করছেন সহমর্মিতার, ক্যামেরা সাক্ষ্য রেখে!
- যখন তথাকথিত বামপন্থা কলেজ স্কয়ারে সভা বন্ধ অথবা সীতারাম ইয়েচুরিকে দুটি এঁড়ে বাছুরের চুলকে দেবার বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লড়াই লড়ছেন!
- যখন পাহাড় উপঢৌকনের কাতুকুতুতে হাসতে হাসতে দাম বাড়িয়ে নেবার জন্য কান্নামুখ করেছে আর তাদের ম্যানেজ করতে প্রখ্যাত ও পার্টটাইমে জেলে বাকিটা হাসপাতালে থাকা ম্যানেজাররা কলসির কানা উপেক্ষা করে প্রেম নিয়ে গদগদ!
ঠিক সেই মুহূর্তে, প্রাইমটাইমে খবর হচ্চে
- সতের বছরের 99% পাওয়া ছাত্রের সাধুর জীবন বেছে নেবার, সম্ভবত আসারাম বাপুর মহিলা উন্নয়ন বা রামদেবের এফ এম সি জি উন্নয়ন ব্রতর মুখ চেয়ে!!
- কাজকস্তানের আস্তানা'য় হতে চলা সম্মেলনে আমাদের হীরকরাজ ওদের নওয়াজ শরিফের সাথে হাত না মিলিয়ে কতটা কূটনৈতিক চাপে ফেলতে চলেছেন পাকিস্তানকে!!
- খড়্গপুরের হাইওয়েতে মিগ 21 নামিয়ে কাশ্মীরের দখল কিভাবে রাখবে আমার মহান দেশ!!
- মুসলিম অভিনেত্রীর রমজানের মাসে পরা বিকিনি ছবিতে কতখানি আহত হল অথবা রেনেসাঁর মুখ দেখল ধর্ম!!
বেশ দেশ আমার💐
আমার গ্রামে, এক অশান্ত সময়ে, রাষ্ট্রের একনায়কতন্ত্র মানতে না চাওয়া কিছু অতিসংশোধনবাদী ওয়ান শটারে রক্তের বন্যা বইয়ে দিত নিজেদের বিচারসভা শেষে, মানতে কষ্ট হত এত সহজে মেরে ফেলবার অধিকার হাতে নিতে দেখে, এখনো হবে। কিন্তু ভন্ড জাতীয়তাবাদটাকে অথবা তাদের ধ্বজা নাড়ানো সংবাদমাধ্যম গুলোকে কোপাতে দেখলে, মাইরি বলছি, হয়ত খারাপ লাগবে না!!!
প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট আগে খবরের কাগজের ওমে ম ম করত, এখন যেন একটুকরো বড়বাজার, পুরনো বড় কাগজের অফিসেও একটা অনিশ্চয়তার হাঁসফাঁস। রূপকথা অবশ্য সাংবাদিক নয়, নিতান্তই বিজ্ঞাপনের বিপণন দেখা তরুণী সেলস ম্যানেজার। এক্সিকিউটিভরাই সবকিছু করে ফেলে, তার কাজ শুধু সুপারভিশন আর রিপোর্টিং, এখনো এই কাগজের নামেই বিজ্ঞাপন আসে, তাই চিন্তা কম।
সাড়ে এগারটা নাগাদ এক কাপ চা নিয়ে করিডরে দাঁড়িয়ে কাজ দেখছিল রূপকথা, ছটা টেবিলেই লোক, ছজন এক্সিকিউটিভ ছজন বিভিন্ন বয়সী লোককে বিভিন্ন ভাবে সহায়তা করছে। সোফাতেও জনাচারেক লোক অপেক্ষা করছেন তাদের সময় আসার। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, নিখোঁজ, আনন্দ, কত কি ছাপার অক্ষরে দেখতে চায় মানুষ।
হঠাৎ করে চোখ পড়ল দরজার কাছে সিকিউরিটির জন্য রাখা টুলে বসা বয়স্কা ভদ্রমহিলাকে। নিতাইদা বোধহয় বাইরে দাঁড়িয়েছে ভদ্রমহিলাকে টুলটা ছেড়ে দিয়ে। এই মহিলাকে চেনে রূপকথা। ওদের ঝাঁ চকচকে য়্যাপার্টমেন্টের উল্টোদিকে রাস্তার ওপারে যে লো ইনকাম গ্রূপের ফ্ল্যাটগুলো আছে তাতে থাকেন। স্বামী আর একটা ল্যাব্রাডর কুকুর ছাড়া কেউ ছিল না। "ছিল না", কারন রূপকথা দেখেছে গত সপ্তাহেই স্বামী পরলোকগত হয়েছেন, এক রোববার সকালে উঠে সারা সকাল ধরে দেখেছে সেই ছোট্ট বাড়িতে গম্ভীর মুখের ভিড়, বাইরের রাস্তার ধারের থেকে ম্যাটাডোরের ওপর স্বামীকে শেষবারের মত তুলে দেবার আগে ভদ্রমহিলা চেয়ে ছিলেন অদ্ভুত দৃষ্টিতে। সে চাউনিতে কান্না জাতীয় কিছু ছিল বলে মনে করতে পারে না রূপকথা। লজ্জা পেল ওর। রূপকথার এই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে অন্যের সংসার দেখার অভ্যাস বহুদিনের। ঠিক উল্টোদিকের এই ছোট ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা বোধহয় ঘুণাক্ষরেও জানে না ওর এই নিঃশব্দ উঁকিঝুঁকির কথা।
অবাক হত রূপকথা। অতটুকু ঘরে একটা ল্যাব্রাডর কুকুর। ঘরের আসবাব আর পোষাকআশাক দেখে খুব সচ্ছলও লাগত না এই পরিবারটিকে। ছেলেপুলে অবশ্য নেই। ওদের দোলনা আর ফুলের টব ওয়ালা মস্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকবার এই ভদ্রমহিলাকে গজগজ করতে শুনেছে এই কুকুরটাকে নিয়ে। আর এখন বোধহয় সেই কুকুরটাই একমাত্র আপনজন, ভাবল রূপকথা।
কোন টেবিলেই ফাঁকা হওয়ার নামগন্ধ নেই। ভদ্রমহিলাকে নিজের কিউবিকলে ডেকে নিল রূপকথা, হাজার হোক জানলা দিয়ে তার বিশ্বদর্শনের এক অসহায় পাত্রী তিনি। পরিচয় দিল না জটিলতা এড়াতে, জানতে চাইল "কিসের বিজ্ঞাপন দেবেন?"। ভদ্রমহিলা বলতে শুরু করলেন "আমার স্বামী .....", আটকে গেলেন, গলাটা ভারী হয়ে গেল বুঝি বাষ্পেতে। ভালবাসা এরকমই, ভাবে রূপকথা, ভদ্রলোক বেঁচে থাকতে এনাকে কেবলমাত্র কথা শোনাতেই শুনেছে রূপকথা, অন্ততঃ যেটুকু আওয়াজ সরু রাস্তা দূরত্ব পেরিয়ে ওদের বাড়িতে ঢুকত। "নেই বুঝি আর, আমি খুব দুঃখিত, আমি আর কি বলতে পারি, আপনার মনের অবস্থা যে কি!!!", পরিচয় না দিয়েও সহমর্মিতা দেখাতে কসুর করে না ও। "আপনি বোধহয় একটা কন্ডলেন্স জাতীয় কিছু ছাপাতে চান, তাই না?"। ভদ্রমহিলাকে বলার সুযোগ দেয় না ও, কি রকম যেন আত্মীয়ার মত সাহায্য করার নেশা পেয়ে বসে রূপকথাকে। মহিলা কিরকম হতভম্ব হয়ে কেবল মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ বের করতে পারেন।
মহিলা একটু অবাকও হন অপরিচিতা এই বাচ্চা মেয়েটির তাঁর পতিবিয়োগের ব্যাপারটা আঁচ করা দেখে, তবে তার বেশি কিছু নয়। রূপকথা বলতে থাকে "আমাদের এই সেকশনে এখন প্রায় সমস্ত স্পেসটারই বুকিং এসে গেছে, আপনি নিশ্চ্ই দেরিও চাইবেন না, এদিকে বেঁচে থাকা জায়গাটা আবার একটু বেশিমাত্রায় কস্টলি"। জানলা দিয়ে দেখা জীবনযাপনের মান চিন্তায় রেখেছে ওকে। "আপনি বরং খুব অল্প শব্দের মধ্যে মেসেজটা লিখে দিন, আমি চেষ্টা করছি যতটা ম্যাক্সিমাম ডিসকাউন্ট দেয়া যায়, খারাপ লাগাটা কৃপনভাবে প্রকাশ করতে কষ্ট হবে জানি, আপনার ভালবাসাটা তো দেখতে পারছি"। ভদ্রমহিলাকে অবাক করে রূপকথার চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল বেরিয়ে আসে। ভদ্রমহিলা আরো হতভম্ব হয়ে যান ওর এই অযাচিত সহমর্মিতায়। হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন।
"কই? লিখে দিন!!!" মনে করায় রূপকথা। "চেষ্টা করুন কম কথায় রাখতে"। ভদ্রমহিলা কেমন থতমত হয়ে এগিয়ে দেয়া প্যাড আর পেনটা টেনে নেন। খুব আস্তে আস্তে মুখ না তুলে খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকেন। 'হায় রে মন, বেঁচে থাকতে ভালবাসাটা বোধ হয় বোঝা যায় না, না থাকলে এরকম একলা আর মনখারাপে বোবা করে দেয়', জন্ম রোমান্টিক রূপকথা ভাবে। কিছুক্ষন আঁকিবুকি কেটে প্যাডটা এগিয়ে দেন ভদ্রমহিলা, তাতে লেখা "৯, নেতাজি আবাসন, পিকনিক গার্ডেন নিবাসী শ্রী ৺অনুরূপ সেনগুপ্তের প্রয়াণে আমরা ব্যথিত"। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রূপকথা, অল্প কথায় হয়েছে, এটা স্পেশাল রেটে করিয়ে দিতে পারবে, শব্দ গুনে নিয়ে বলে "আপনি চাইলে আরো খান চারেক শব্দ ঢুকিয়ে দিতে পারেন, একই প্যাকেজে হয়ে যাবে"। এইবারে ভদ্রমহিলা যেন খানিকটা খুশি হয়েই প্যাডটা আবার টেনে নেন। খান চারেক শব্দ যোগ করে প্যাডটা আবার ঠেলে দেন রূপকথার দিকে।
তাকিয়ে দেখে রূপকথা, ওতে লেখা আছে "৯, নেতাজি আবাসন, পিকনিক গার্ডেন নিবাসী শ্রী ৺অনুরূপ সেনগুপ্তের প্রয়াণে আমরা ব্যথিত। একটি ল্যাব্রাডর বিক্রি আছে"।
(অনুপ্রাণিত)
স্ত্রী: আবার তুমি গরমের দুপুরে ওখানে? ডঃ আচার্য বারণ করেছেন না? এমনিতেই তো মাথা ..... আবার এই গরমে একটা বিপদ হয়ে না যায়!!!
কর্তা: গিন্নি, শেঠেদের এই আমবাগানে এককালে দশ গাঁয়ের বিচার বসতো, জমিদার দর্পনারায়ন এর ডাকে উড্রো সাহেব অব্দি কাছারি থেকে এসে এই আমবাগানে এসে সেবা নিতেন, আবার তারিনী যখন ম্যাজিস্ট্রেট উইলসনকে গুলি করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে তখন বাবা ওকে এই আমবাগানে লুকিয়ে রেখেছিলেন, ইংরেজদের পোষা পুলিশের সাহস হয়নি ....
স্ত্রী: বাবা মনে? তুমি তো তোমার ঠাকুর্দার বাবার গল্প করছ, তুমি না!!! সকালের ওষুধটা...?
কর্তা: আরে রাখ ওষুধ, ঐ ব্রজর ছেলের কবরেজিতে আমি ইয়ে করি, আমাদের জমিদারির ফ্যামিলি ফিজিসিয়ান কে ছিলেন জান? ক্যালকাটা মেডিকেলের পেনেলবেরি সাহেব!!!
স্ত্রী: আরে ব্রজ আবার কে? ডাক্তারবাবুর বাবা তো বিজয়বাবু, তুমি আবার বিজয়বাবুর দাদুর কথা বলছ না তো? আর শোন, জমিদারি আর নেই, ইন্দিরা গান্ধী আজ থেকে 50 বছর আগে জমিদারি তুলে দিয়েছে, কবার বলব তোমায়?
কর্তা: ইন্দিরাআআ!!! হুহ!!! তবে যাই বল গিন্নি, জহরের মেয়ে দেখতে কিন্তু হয়েছে একঘর!!! একবার শান্তিনিকেতনে ... থাক সেকথা!!!
স্ত্রী: তুমি তাকে নিয়েই থাকো তাহলে। দাদু দিদিমার কাছে মানুষ বলে এই মানুষের হাতে পড়তে হল আমায়। কতবার বলি চল কলকাতায় গিয়ে বাবা আর ঠাকুরপোদের বালিগঞ্জের বাড়িতে গিয়ে থাকি। তা নয়, এই ধ্যদ্ধেড়ে মালদা আর আমবাগান। আর শোন, খবদ্দার আমায় গিন্নী বলবে না, এটা কোন যুগ? আর প্লিজ, আমবাগানে বসে থাকা বন্ধ কর।
কর্তা: আরে আমবাগানে বসে থাকা এত ফেলনা নয় গিন্নি। এই তো সেদিন বুড়োবয়সে বৌমার চাপে সন্ন্যাসী রাজা না কি যেন একটা বায়োস্কোপ দেখতে গেছিলাম। তা দেখলাম বৌমাদের চোখের মণি ঐ উত্তমকুমার না অধমকুমার, সে আমবাগানেই লেঠেলদের প্যাঁচ শেখাচ্ছে, আর তুমি।
স্ত্রী: সিনেমা দেখতে গেছিলেন তোমার দাদু, আমার শ্বাশুড়ির চাপে পড়ে। তোমার এই টাইম ট্রাভেল, উঃ। তোমাকে বোঝান আমার অসাধ্য। যাই বরং ইসটিকুটুম দেখি গিয়ে। হ্যাঁগো, বিক্রম কে জেলে দেবে না তো?
কর্তা: ফুঁহ!!! বেধবা মেয়েছেলেকে ফুসলিয়ে নিয়ে কলকাতায় পালালে আজকাল আবার জেল হয় না কি? কোন যুগে যে আছ!!! তার থেকে রামতারনকে বল তামাকটা পাঠাতে।
(স্ত্রী এর হাল ছাড়ন ও রাগত বিদায়)
ঘন্টুর বয়স আঠার মাস। বেয়াক্কেলে ছিঁচকাঁদুনে। সন্ধ্যা পেরলেই আজান ও ভজন ছাপিয়ে সোনু নিগমকে ভয় দেখাবে এমন চিৎকার। সুশীলাবৌদি ভোলাতে না পেরে পাশে বসে নিজেই কাঁদতেন। বৌদি আর ঘন্টুর ঠাকুমা দুজনেরই দৃঢ় ধারণা ঘন্টু এটা যথাক্রমে বাবার বাড়ি ও মামার বাড়ির অভ্যাস পেয়েছে।কয়েকদিন হল ঘন্টু কাঁদছেনা, সন্ধ্যে হলেই "মাম্মাম উব্বাপ" বলে চোখ বন্ধ করে থাকে। বৌদিও থাকেন হতভম্ব হয়ে।
ডঃ সরকার বারিনবাবুকে দেখছেন তিরিশ বছর। অনেকদিন প্রেসার কমানর ওষুধ লিখে আসছেন কিন্তু বারিনবাবু পাত্তাও দেন না বন্ধুস্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শকে। তিনি বলেন রামদেবের লাউয়ের (বাগানের) জুস খেয়েই সব নরমাল থাকে, য়্যালোপাথ আর গাঁটকাটারা একই মাল। ডঃ সরকার আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। কয়েকদিন হল বারিনবাবু সপ্তাহে দুবার আসছেন, জিজ্ঞাসা করেছেন দিনে দুবেলা একটা করে যেটা লিখেছেন ডঃ সরকার, দেড়টা করে খেলে কি খুব খারাপ হবে?
মুক্তিদাদু বসুবাবুর কনভয় এর হাবিলদার ছিলেন। দাদু মারা যাওয়ার পরেও মুক্তিদিদা ঘোরতর 'মাকু'। মৃনতুল ও জেপিবি কে কাঁসার বাসন পড়ার আওয়াজে গালমন্দ না করে ঘুমোন না। পাড়ার লোকে জানতে পারে মাননীয়া পিসিমা কি কি করলেন ও তার জন্য বাংলার কি কি ক্ষতি হল, মানে বসুবাবুও কি কি ক্ষতি তার ব্র্যান্ডের কর্ম(!)সংস্কৃতিতে করে যেতে পারেন নি যেটা পিসিমা করছেন চপ ভেজে। এহেন মুক্তিদিদাও কদিন হল চুপ। বিশেষতঃ সন্ধ্যের পরে। জিজ্ঞাসা করলেই মুখ থেকে একটা ঘুঁ ঘুঁ শব্দ করে বলছে "আর কি?! আমাদের দিন তো ফুরাল".
70 পেরনো অরোরাজি সেন্ট্রাল মেট্রোর পাশে একটা গলিতে একটা singing বার চালান। অনেক বলাতেও তার singing বারকে dance বারে উন্নীত করতে রাজি হননি অরোরা সাহেব। পনেরো বিশ বছর ধরে গেয়ে আসা কুলসুম বা প্রতিমারা কোথায় যাবে বার বদলে গেলে? কুলসুম এর গলায় আজো "লাগ জা গলে" কথা বলে। প্রতিমা এখনো স্টেজে উঠবার আগে অরোরা সাহেবকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে ওঠে। Dance বারে এসব পাবে? হুঁ হুঁ বাবা? কিন্তু দিন কয়েক হল সন্ধ্যের পর থেকে ফাঁকা ফাঁকা। লজ্জার মাথা খেয়ে পাশের ডান্সবারের মালিক ইসমাইল ভাই কে জিজ্ঞাসাও করেছেন একবার, ইসমাইল ভাই বলছেন তার আড্ডাতেও এই ভাঁটার টান। মাতালরা সব গেল কোথায়? অরোরাজি ভাবেন। বাকি রাস্তাঘাটে তো ভিড় কম নেই!
অর্নব গোস্বামী ফিরেছেন তার নতুন নিউজ চ্যানেল রিপাবলিক নিয়ে।
ভাল থাকুন।
সুস্থ থাকুন।