Friday, August 23, 2019

বাজে গল্প ৩

সুধন্য ঘোষাল ধেনো খেতে ভালোবাসতেন। বৌদির হোটেলের পেছনের দরজায় ব্লাডার থেকে সরাসরি গ্লাসে ঢালা বসিরহাট থেকে আমদানি করা ধেনো গলা দিয়ে নামতো যখন, সুধন্যর মনটা চুলকে উঠতো আনন্দে।

রোজকার মতো বিকেলে সেই দেবভোগ্য ধেনোতে চুমুক মেরে বুঁদ হয়ে গঙ্গার জলে পা ডুবিয়ে বসেছিলেন সুধন্য আর আকাশপাতাল ভাবছিলেন। পাড়ের মন্দিরটার চাকচিক্য ফিরেছে বছরখানেক হলো। জগন্নাথ পন্ডিত রাধাকেষ্ট নিয়ে বসে থাকতেন যে কালে, দু চারটে বুড়োবুড়ি আর সুধো মাতাল ছাড়া সে কেততন শোনার লোক পাওয়া যেতো না বড় একটা। এখন সে মন্দিরে বেশ বড়সড় বজ্রঙবলি, তার দ্বিধাবিভক্ত বুক এর মধ্যে হাসিমুখে শ্রীরামচন্দ্র ও সীতামাতা, সামনে বেশ কিছু ভক্ত আর টুংটাং করা দানবাক্স। জগু পন্ডিত বাতের ব্যাথায় নড়তে পারেন না। মুদিদোকানের শিউপুজনের ভাগ্নে রামশরন মিশির আজকাল বেশ দুলে দুলে হুংকার দিয়ে পুজো করে।

খানিকটা ঢুলুনি এসেছিল, ঠিক এমনসময় রামশরন এর বাজখাই গলার ডাক শুনে খোঁয়ারি চটকে গেলো সুধন্যর।

"সুধোকাকা! আবার খেয়েছো ওসব ছাইপাঁশ?"

সুধন্য ছোপ ধরা দাঁত বের করে বললেন "হেঁ হেঁ"!

"তোমায় বলেছি না, এসব ছাড়। সন্ধেবেলায় মন্দিরে এসে একটু বোসো। পুজোর কাজকম্মে একটু হেল্প টেল্প করে দাও। আমি যেদিন মিটিং এ যাই, লোকজন এসে ফিরে যায়। বলি, ব্রাহ্মণ মানুষ, একটু ধর্মকর্ম তো করতে পারো এই শেষ বয়সে এসে"।

সুধন্য আবার হেঁ হেঁ পূর্বক বললেন "সে ভাগ্নে কোনদিনই তো তেমন ..... হেঁ হেঁ"।

"ছ্যাঃ", রামশরন মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠলো "তোমাদের জন্য দেশটা টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিলো সত্তর বছর ধরে"!

সুধন্য মাথা নিচু করে স্বীকার করলেন। তারও আজকাল সবসময় মনে হয় দেশটা তার মতো লোকজনের জন্যেই ডুবে যাচ্ছে।

উদ্ধার করার শেষ মরিয়া চেষ্টা করল রামশরন। "বলো তো কাকা, বলো জয় শ্রীরাম, সব পাপ ধুয়ে মুছে যাবে"।

তিলমাত্র সময় না নিয়ে সুধন্য বললেন "জয় শ্রীরাম ভাগ্নে"! সুধন্য ধর্মতলায় বিফ ফেস্টিভ্যাল এ যোগ দেননা, বৌদির হোটেলের ঝাল ঝাল মুরগির কশা মাংসই তার কাছে যথেষ্ট। কানাঘুষো তিনি এটাও শুনেছেন জয় শ্রীরাম বললে কাটমানি দিতে হচ্ছে না আজকাল, যদিও তার কাটমানি দেবার মত কাজকারবার কিছুই নেই।

"এভাবে হবে না", শ্রীরাম এর জয়গানের মাত্রা সন্দেহজনক ঠেকলো রামশরন এর কাছে, "তোমায় আজ খুঁজে পাওয়াবো ভগবানকে"!

টানতে টানতে সুধন্য কে নদীর এক্কেবারে কিনারায় নিয়ে গেলো রামশরন। গলা ধরে ডুবিয়ে দিলো জলের মধ্যে মাথা। মন্দির থেকে লোকজন মজা দেখতে নদীর ধারে এসে জমেছে একে একে।

কলার খিমচে ধরে তুললো দু সেকেন্ড পরে। জিজ্ঞাসা করলো "পেলে রামচন্দ্রকে? মন যখন একদিকে যাবে তখনই পাওয়া যায় ভগবানকে"।

হাঁপাতে হাঁপাতে সুধন্য বললেন "না, ভাগ্নে"। গলার স্বরে যার পর নাই লজ্জা মিশে।

পাড় থেকে হা হা করে হেসে উঠলেন ভবতারন মুখুজ্জে। "তোর সমাজ সংস্কার আর হলো না ভাগ্নে"।

জেদের বশে আবার সুধন্যর মাথাটা ডুবিয়ে দিলো জলে রামশরন। এবারে অন্ততঃ পাঁচ ছ সেকেন্ড। হাত এ খামচে ধরেছে সুধন্য। আবার জল থেকে বার করে জিজ্ঞাসা করলো "পেলে রামচন্দ্রকে? না এখনও মন পড়ে আছে ওই ধেনোর ঠেকে?"।

সুধন্যর বুকের ভেতরটা হাপর এর মতো করে উঠছে। পাড় থেকে ভোলার পাঁচ বছরের যমজ ছেলেদুটো হাততালি দিয়ে উঠলো। আজ নতুন খেলা। সুধোদাদুকে ডোবানো। ফিশ ফিশ করে বলে উঠলেন সুধন্য "না রে ভাগ্নে, শুধুই অন্ধকার"!

অগ্নিশর্মা রামশরন প্রায় জলে ছুঁড়ে ফেলে মাথা চেপে ধরলো সুধন্যর। দশ সেকেন্ড। পনেরো সেকেন্ড। মজা দেখতে আসা জনতা একটু সংশয়ে, কিন্তু রামশরন এর মুখের ওপর আজকাল কথা বলে না কেউ। শেষে ভবতারনই বলে উঠলেন, "রামু, ভাগ্নে, ছেড়ে দাও ওকে, পাখির মতো শরীর, বাঁচবে না যে"!

ফোঁস ফোঁস করতে করতে সুধন্যকে গলা ধরে তুলে এনে ছাড়লো রামশরন। খাবি খাচ্চিলেন সুধন্য। একবার ধেনোতে হসপিটালের য়্যালকোহল মিশিয়ে খেতে গিয়ে ঠিক যেমনটা হয়েছিল। লাল চোখ নিয়ে অগ্নিশর্মা রামশরন জিজ্ঞাসা করে উঠলো সুধন্যকে "পেলে শালা? রামচন্দ্রকে? নাকি আবার ডোবাবো বোকাচোদা"?

সুধন্য মাটিতে শুয়ে শুয়েই প্রায় মাটির সাথে মিশে গেলেন লজ্জায়। পেট গুলিয়ে উঠছিলো। চোখে অন্ধকার। তাও ক্ষীণ কুন্ঠিত গলা অপরাধবোধে ডুবিয়ে শেষবারের মত জিজ্ঞাসা করে উঠলেন, "না ভাগ্নে, দেখলাম না, তুমি ঠিক জানো, এইখানেই ডুবে গেছিলেন উনি"?

অজ্ঞান হয়ে গেলেন সুধন্য।

Sunday, July 28, 2019

এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ ১

#এই_মৃত্যু_উপত্যকা_আমার_দেশ_১

জুন 2017: চাকরির প্রত্যাশায় আসা 16 বছরের নাবালিকা ধর্ষণ এর অভিযোগ জানায় উত্তরপ্রদেশ এর বিজেপি এম এল এ কুলদীপ সেনগার, তার ভাই ও সাঙ্গপাঙ্গদের ওপর।

জুন 2017 ~ এপ্রিল 2018: পুলিশ এফ আই আর নিতে অস্বীকার করে। কোর্টে কেস করা হয়। এবং লক্ষ্য লক্ষ্য কেস এর মতো এটাও চলতে থাকে।

3 এপ্রিল 2018: কোর্টে হিয়ারিং এ আসা মেয়েটির বাবাকে পেটায় বিধায়ক এর পরিবার। দুটি পুলিশ কম্প্ল্যান্ট হয়। একটি মেয়েটির বাবার ও একটি বিধায়ক এর পরিবারের তরফ থেকে। পুলিশ একটি অভিযোগ এর ওপরই ব্যবস্থা নেয় ও মেয়েটির বাবাকে গ্রেফতার করে ও জেল এ পাঠায়।

8 এপ্রিল 2018: মেয়েটি মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ এর বাড়ির বাইরে নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহননের চেষ্টা করে।

9 এপ্রিল 2018: জেল থেকে মেয়েটির বাবাকে বমি, পেট ব্যাথা, পিঠ থাই পাছায় অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন ও সেপ্টিসেমিয়া নিয়ে হসপিটাল এ ভর্তি করা হয়, এবং, মেয়েটির বাবা মারা যান।

প্রথমে অসম্ভব তৎপরতার সাথে 6 জন ডাক্তারকে সাসপেন্ড করা হয় চিকিৎসাগত ত্রুটি প্রমান করার জন্য। চিকিৎসকেরা তীব্র প্রতিবাদ জানান ও উল্টো প্রমান রাখেন। এরপরে জনতা পথে নামে জানতে চেয়ে।

তখন, পরিস্থিতির চাপ এ 6 পুলিশকর্মী সাসপেন্ড হন।

পুলিশ বিধায়কের এক সহকারীকে গ্রেফতার করে।

10 এপ্রিল 2018: পোস্টমর্টেম রিপোর্টে জানা যায় মেয়েটির বাবার শরীরে অজস্র আঘাতের চিহ্নর কথা।

11~12 এপ্রিল 2018: সিবিআই দায়িত্ব নেয় কেস এর। চার্জশিট এ অবশেষে কুলদীপ সেনগার এর নাম আসে। জেল এ যান কুলদীপ ও তার ভাই, কেস চলতে থাকে, চলতে থাকে।

.........................

.........................

কিন্তু এ তো ঠিক মনোমত শেষ লাগছে না, তাই না?

সেজন্য অবশেষে এসেছে 28 জুলাই 2019। লইয়ার আর আত্মীয়ার সাথে লখনৌ এর দিকে চলতে থাকা মেয়েটির গাড়িকে পেছন থেকে ধাক্কা মেরেছে ট্রাক। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হসপিটাল এ ভর্তি সে।

এইবার চেনা চেনা লাগছে না? উপসংহার?

আসুন, অনেক হলো, মেয়েটিকে মেরে ফেলি এবারে। জেলবন্দি নেতাদের বের করে আনা খুব দরকার। আমাদের রকেট আবার চাঁদে গেছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এই চন্দ্রযান ২ প্রমাণ করে আমরা ভুল সংশোধন করে ফিরে আসবার শক্তি রাখি।

ভুল হয়ে গেছে কুলদীপ সেনগার এর সাথে। আসুন, সংশোধন করি।

😶

Thursday, April 4, 2019

গুপি গাইন বাঘা বাইন

স্নেহের বাবু,

তোমার গল্প শোনাবার আবদারে আড়ষ্ট হয়ে যেতে দেখে বাবার ওপর হয়ত রাগ হয় তোমার। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার রাপুনজেল বা সিন্ডারেলার গল্প বাবা খুব একটা সহ্য করতে পারে না কোনকালেই, এক পাতা দক্ষিণারঞ্জনও মন থেকে পড়েনি বাবা এমনকি ছোটবেলাতেও।

তা বলে রূপকথা কি পছন্দ নয় বাবার? সেরকম নয়। ঠিক যে সুন্দর গল্পটা ছেলেভুলানো গল্পের ছলে বলতে বলতে তোমার মধ্যে গল্প ছাড়াও ছোটবেলা থেকে বড়, সত্যিকারের বড় হয়ে ওঠার বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে, ঠিক যেমন করে তোমার দাদু ঢুকিয়ে দিয়েছিল তোমার বাবার মধ্যে, প্রথম সরকারিভাবে সিনেমা দেখার অনুমতি দিয়ে, ক্লাস টু তে গুগাবাবা দেখতে দিয়ে, সেরকম গল্প বলতে পারলে বাবা ধন্য হয়ে যাবে। কিন্তু সে গল্প বলবার ক্ষমতা আর কজনই বা রাখে।

কোনদিন যদি তুমি আমার আগ্রহ নিয়ে এই সিনেমা দেখতে শেখো, রাজা, রাজকন্যা, ভূত, বর, গানবাজনা এসব এর পরিধি পেরিয়ে, বলতে শেখো এমন এক ভাষা, যেখানে "উঁচা নীচা ছোট বড় সমান", জানবে বাবা গল্প বলতে না পারলেও, ঠিক এইটুকু হোক তা চেয়েছিল।

রাজ্যের প্রজা ঝাঁঝিয়ে উঠে যখন জবাব দেয় "যে রাজা খেতে দেয় না, তারে আবার খাজনা দেয়া কি?", ভুখা পেটের সিপাহী খাওয়ার কথা তুললে মুখে খাবার ঠাসা মন্ত্রীমশাই যখন বলে ওঠেন "আজ বাদে কাল যুদ্ধ হবে, তোমাদের এত খাইখাই কেন বলতো?", ঠিক তখন রাজার প্রিয়পাত্র না হতে চেয়ে যদি তোমার বিরুদ্ধ মত সবার সামনে নির্ভয়ে রাখতে পারো, জানবে সবথেকে প্রিয় গল্পটা বাবা তোমাকে বলে ফেলেছে এক লম্বা মহীরুহের ক্যামেরা দিয়ে।

রাজার যুদ্ধের অশ্লীল গান আর নাচে সায় না দিলে যখন জল্লাদ ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে, তখনও যদি একদল সৈন্যের সামনে তপেনসুলভ সারল্য অথচ দৃঢ়তার সাথে বলতে পারো "রাজ্যে রাজ্যে পরস্পরে দ্বন্দ্বে অমঙ্গল", জানবে এই গল্পটা তোমাকে বাবা বলে যায়নি, কিন্তু চেয়েছে তুমি জানো সেই মহান মানুষটির সৃষ্টি থেকে। জানবে বাবার গল্পেও সেই কথাই থাকত, যে যুদ্ধ নয়, পেটের খাবারই প্রাথমিক প্রয়োজন, আর সে খাবার না পেলে বড় বড় যুদ্ধবাজদের পরিকল্পনা, এমনকি সাধারণ মানুষেও ভেস্তে দিতে পারে।

এমনকি বাবা চেয়েছিল, তুমি যখন এ গল্প দেখে আর মনে নিয়ে বড় হয়ে উঠবে, তখনো যেন এই গল্প তোমাকে নিস্তার না দেয়। বড় হবার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ দুঃখ আসবে, এলে মনের ভেতর গুনগুন কোরো, "যার ভান্ডারে রাশি রাশি, সোনা দানা ঠাসা ঠাসি, যেনো দুঃখ তারও হয়"। আরো বেশি মন খারাপ যখন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধবে সিংহাসন বা বড় দায়িত্বে বসা তোমাকে, জানবে রাস্তা দেখানো আছে ওই একই গানে, "দুঃখ কিসে যায়, প্রাসাদেতে বন্দী রওয়া বড় দায়, একবার ত্যাজিয়ে সোনার গদি, রাজা মাঠে নেমে যদি হওয়া খায়, রাজা শান্তি পায়"।

তাই বাবা অপেক্ষা করছে, কখন সেই সর্বাপেক্ষা রূপসী রূপকথা তোমার নজরে আসে আর মনে গেঁথে যায়।

এইটুকুই।

তোমার বাবা।

Monday, February 25, 2019

দেশদ্রোহী

"যুদ্ধ নয়? শান্তি চাই?? শান্তি!!! শালা নিজেকে বাঙালি বলতে লজ্জা করে না আপনার? জানেন, এই বাংলার থেকে ক্ষুদিরাম বোম মেরে ফাঁসিকাঠে গেছে? নেতাজির ভয়ে ইংরেজ এর হৃৎকম্প উঠেছে? রবীন্দ্রনাথ নাইট উপাধি লাথি মেরেছেন?"

হ্যাঁ, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই উগ্র দেশপ্রেম থেকে সাবধানও করেছেন বারেবারে সেটা তো মানেন?

"কি বলছেন মশায়? রবীন্দ্রনাথ এর থেকে বড় দেশপ্রেমী আর আছেন নাকি? রবীন্দ্রনাথ প্রথম বঙ্গভঙ্গ রুখেছিলেন, দ্বিতীয়টা আর রোখা যায়নি, কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ কলকতাটা পাকিস্তানে যাওয়া থেকে আটকেছিলেন, হোয়াটসয়াপ এ পেয়েছেন নিশ্চই?"

ইয়ে, আপনি চার অধ্যায় পড়েছেন? এক দেশপ্রেমিক বিপলবী দলের নেতা মাষ্টারমশাই কখনো দলের মোহে এক মহিলাকে দলের মধ্যমনি বানিয়ে রাখেন ছেলেদেরকে দলে আটকে রাখতে, আবার তাকেই সরিয়ে দেবার জন্য হাত কাঁপে না তার যখন সে মেয়ে ভালোবেসে ফেলে দলের সেরা ছেলেটিকে? পড়েছেন?

"কি বলছেন মাইরি? এ সব লিখেছে দাড়িবুড়ো?"

লিখেছেন তো! আর ঘরে বাইরে? যেখানে জমিদার নিখিলেশ স্বদেশী দলের নেতা সন্দীপকে বলছেন, স্বদেশী যদি তার জমিদারির গরিব লোকেদের, যার অধিকাংশই গরিব মুসলমান, রুটিরুজিতে টান ফেলে তবে সেই স্বদেশী তিনি হতে দেবেন না?

"য়াঁ! ইল্লি! আবার মুসলমান? শালা একা নেহেরুতে রক্ষা নেই শালা শিলাইদহের অত্যাচারী জমিদারটা দোসর ছিল বলছেন??!! শালা এই সব লিখে মালটা আশি অব্দি বেঁচে গেলো? বাংলাটা শালা আপনার মতোই বিনা শিরদাঁড়া মালে ভর্তি, একটা নাথুরাম জন্মায় না শালা।
যাই হোক, একটু ধন্যবাদ আপনারও প্রাপ্য। আমি আবার একটু শিক্ষাফিক্ষা নিয়ে থাকি বুঝলেন? দু চারটে স্কুলের ম্যানেজমেন্ট এ আছি। নিজেরও একটা স্কুল খুলছি এ বছরই, নাম দিচ্ছিলাম আরেকটু হলে 'রবীন্দ্র বিদ্যালয়', লাইসেন্স ও চলে এসেছে ওই নামে।"

তাহলে এবারে কি করবেন?

"দাদা, ওই দেশদ্রোহীর ভাবনা তো রাখা সম্ভব হবে না স্কুলে। সহজপাঠ টহজপাঠ এক্কেরে বাদ।কিষেনজির কথা বা কথাঞ্জলি রাখব সিলেবাসে তাও ভালো।"

আর স্কুলের নামটা?

"ভেবে নিলাম এক্ষুনি। পুরোনোটা না বদলে একটা শব্দ গুঁজে দেব। এখনই বলছি না। আপনার ঠিকানাটা দিন একটা হ্যান্ডবিল আপনাকেও পাঠিয়ে দেবখন। হাজার হোক আপনার শ্বশুরবাড়ির এলাকা, দু-একখান ছাত্র আপনিও, মানে, হেঁ হেঁ"।

.
.
.

আজ সকালের ডাকে এসেছে।

হ্যান্ডবিল।

ছবি রইল।

Tuesday, October 9, 2018

এক আকেলা মনখারাপ

দিকভ্রান্ত, ঠিকানাভোলা
উদাসীন, মনখারাপি
ইমারত, ডিভাইডার আর মেশিনপত্রের ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে
অভ্যেস এর বশে পকেট হাতড়ে চমকে ওঠা
আর, দিন গুজরান এর নিত্যিনতুন তত্ত্বতালাশ।
বেলাশেষে একটা ছাত এর আশা,
পাবে?

সকালের আলোয় মুখ লুকোনো
রাতের কালোয় গিলে ফেলার ভয়
চোখের কালির আঢাকা অস্বস্তি
জল শুকোনো, কিন্তু কান্নার ভাপে ভেজা।
ছেলে ঘুমিয়ে পড়লো এতক্ষনে নিশ্চই,
পারবে ফিরতে?

সময় রাস্তা কেবলই এগোয়, ফুরোয়? না,
তবু কত লোকে বেরিয়ে পড়েছে আড় ভেঙে
শুধু বেরিয়ে পড়ার ছটফটে অভ্যেস এ
অথবা, বসে থাকতে, চেয়ে দেখতে, লজ্জা পেত বলে।
খুঁজছে, আরেক উদভ্রান্ত, জিরোবে একসাথে দুদন্ড,
দেখা হবে?

Wednesday, July 25, 2018

অল্প কল্প গল্প ১

'শুনছ?'

হুমমম...

'শুনছ?'

হুমমম...

'আরে একটা মিনি লগ আউট করো না মিনিট পাঁচেক এর জন্য ক্লাউডঅফিস থেকে!!'

উফফফ। দাঁড়াও। হুমম। এবারে বল।

'বলছি টেসলা থেকে টেলিপ্যাথিটর এ একটা সেনসেজ পাঠাল এইমাত্র।'

আবার সেই প্রাক একবিংশ যুগ এর কুমড়োর ছক্কার রেসিপি???!!! তোমার ব্রেন ম্যাপিং করে ওরা এইসবই তো পাঠাতে থাকে!!! আবার কুমড়ো আনতে য়্যামাজন ইথিওপিয়াতে অর্ডার দাও, গন্ডা গন্ডা পয়সা ভর হাইপারলুপ ডেলিভারির!

'ধেততেরি! সেসব না! ঘন্টু!'

সে ঘুমিয়েছে?

'হ্যাঁ, অনেকক্ষন, তবে ওকে নিয়েই সেনসেজ টা'

কি বলছে?

'বলছে একটা মেজর ম্যানুফ্যাকচারিং ডিফেক্ট রয়ে গেছে'

সে কি হে? টেসলার রোবোবেবি তে ডিফেক্ট? তবে যে কি সব জিরোসিগমা ফিগমা বলে বারফটটাই মারে?!!!

'শোনোই না! বলছে স্লিপ বাটন দিতেই নাকি ভুলে গেছে। খুব দুঃখপ্রকাশ করেছে আর বলেছে বদলে আনা যাবে বিনাখরচে, সাথে একটা রোবোডগি ফ্রি দেবে'

তুমি কি বল?

'অনেক ভাবলাম। কিন্তু তোমায় খুলেই বলি, এই প্রতিদিন ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘন্টুকে ঘুম পাড়াতে মন্দ লাগে না। তুমি কি বল?'

আমি? না, সে রাত্রে ঘুমোতে না চেয়ে চশমার ডাঁটি চেবালে রাগ হয় বটে, তবে পেছনে চাঁটা খেয়ে রাগ করে যখন ঠোঁট ফুলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তখন একঘর আদর আদর লাগে কিন্তু। ঘন্টা ওরমই থাক।

'ঠিক বলেছ, স্লিপ বাটন মাথায় থাক। বালাই ষাট আমাদের ঘন্টুর।'

Wednesday, June 6, 2018

মা রিপ্লাগড নিষাদ!

"দেখুন রত্নাকর বাবু, এই নারদ মিত্তির আর ব্রম্ভানন্দ বোস এর রিকভারি এজেন্সি আজ অব্দি কখনো ফেল মারেনি। ই এম আই বলুন, ঘর ওয়াপসি মেয়েছেলে বলুন, তরমুজ সুব্রত মুখুজ্জে বলুন, সব ঘরের ছেলে ফেরত এনে দিয়েছে ঘরে।

আমরা মানুষে বিশ্বাস করি। আপনার মুখ দেখেই মনে হল ভিড় বাসে কনুই মারার ন্যায্য পেট্রিয়ার্কি অব্দি কোনদিন চাখেননি আপনি। টুলো পন্ডিতের বাড়ি জন্ম নিয়ে আজানের শব্দে ঘুম ভেঙ্গেও কখনো বলেননি 'ওদের বাড় বড্ড বেড়েছে'। সেজন্যেই আপনাকে ঘরে যেতে দিলাম একা, শেষ অপশন হিসেবে।

কিছু জোগাড় হল? অন্ততঃ এমাসের হাউসিং লোন এর কিস্তিটা? আপনার মাইরি বাপ পেনশন পায়, বৌ আর ভাই চাকরি করে, ই এম আই ডিফলটার হওয়া কি আপনার মানায়?"

রত্নাকর খানিকটা ঝিমিয়ে ছিলেন তৃণমূল এর বংগবিভূষন পাওয়া বামপন্থী তাত্ত্বিক এর মতন। এইবারে ফেটে পড়লেন হতাশার রাগে।

"স্যার, ছেড়ে দিন এসব দুঃখের কথা।

ঘরে বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম কিছু ধারের জন্যে। মা বললে, 'আজ 10 বছর ধরে শুধু বাড়িভাড়া অথবা ই এম আই ছাড়া এক পয়সা ঠেকাও না তুমি। পেনশন বাড়ে না, না বাড়ে তোমার কন্ট্রিবিউশন, এমনকি মোদির 15 লাখও ভাতে বাড়ল না চার বছরে। তোমার পাপ আমরা নেব ক্যানে? এমনিতেও তোমার মত মেনিমুখো ব্যাটন না খেলে জ্ঞানচক্ষু খুলবে না।'?

বৌকে বললাম দুঃখের কথা। বৌ বলল, 'তুমি সারাজীবন আমায় কি দিয়েচ বলবে, যে আজ আমায় সারদা সুদীপ্তর দেবযানী ভেবে পুজোকমিটির মত চাঁদা চাইতে এসেছ? মাসের শুরুতে ঐ দয়া করে বাড়ির ই এম আই, কাজের লোকের মাইনে, ঘোঁতনের স্কুলের মাইনে, স্টেশনারি আর মুদি দোকানের পয়সা, ফোনের ডাটা, ইলেক্ট্রিসিটি বিল ভরে মাথা কিনে নিয়েছ? পনের বছর ধরে বিয়ের আংটি বদল করবার কথা বলছি, আমার বৌবাজারের অফিসের গলিতে এম সি সরকার থেকে একটা মঙ্গলসূত্র দিতে বলেছি, কোনদিন কানে নিয়েছ সে কথা? আমার বাপ মা এ কোথায় ফেলে দিল ঈশ্বর! আজ দশটা ডাক্তার প্রফেসর ধাওয়া করত বাড়ি অব্দি আমার সম্বন্ধ নিয়ে।'

ভাই বলল, 'দাদা, ডোনেশন দিয়ে ডাক্তারিতে ঢুকিয়েছিলি ঠিক আছে। সাথে রেখেছিলি ঠিক আছে। কিন্তু দু পয়সা কখনো হাতে তুলে দিয়েছিলি সিনেমা দেখবি বলে?! আজ বিনে পয়সায় ওষুধ লিখিয়ে নিতে নিতে ই এম আই চাইবি? এর থেকে সোজাসুজি বলে দে আলাদা হয়ে যাই!!!'"

গলা বুজে আসে রত্নাকর এর। তাও বলে চলেন ...

"নারদ বাবু, ছাড়ান দিন এসব, বাড়ি আপনি জবরদখল করুন, ফিরিয়ে দিন ব্যাংক কে, যা খুশি করুন।

আমি আপনার ডেরা থেকে বেরিয়ে আর বাড়ি ফিরছি না। যৌবনে রগরগে গল্প, চিটচিটে ভাবালুতা মিটমিটে প্রেম আর টসটসে ইমোশন দিয়ে বলবার অভ্যাস ছিল খুব বন্ধু বান্ধবী দের। নিজের নাম ভাঁড়িয়ে রাখব যুগের উপযোগী দো-আঁশলা কিছু, যেমন, 'অসভ্য-মিকি' বা এরকম কিছু একটা, চিৎপুরে একটা এককামরার ঝুপড়ি নেব ভাড়া, আর যাত্রার চিত্রনাট্য লিখব।

একটা সামাজিক আইডিয়া তো এক্ষুনি মাথায় খেলছে। নাম রাখা যায় 'রামের উন্নয়নের টাকায় সীতের কন্যাশ্রীর সাইকেল'। ঐ দিয়েই শুরু করি। পরে স্বচ্ছ ভারত নিয়েও কিছু একটা নামাবখন।

আপনারাও ভালো থাকুন।"

হনহন করে হাঁটা দেন রত্নাকর রায়।

হতভম্ব নারদ মিত্তির ডান কান চুলকে রত্নাকর এর ফেলে যাওয়া পথের পানে তাকিয়ে চোখ বুজে থাকা ব্রম্ভানন্দকে বলেন, "ছোকরা মহাকাব্য লিখবে একদিন, মিলিয়ে নেবেন"!!!

Tuesday, May 22, 2018

ঘুম ও জেসুদাস

কখনো কোন সমান্তরাল বিশ্বে, রেষারেষি আর স্বার্থপরতার ঝকমকে আলো কমে এলে পর, কিশোর রফি মান্না ইত্যাদি গুরুপুজোর ভক্তদের হইহুল্লোড় ফিকে হবার পরে, ঝড়ের পরের ঠান্ডা হাওয়ায় মাটির পিদিম জ্বালিয়ে গান গাইতে বসেন কাট্টাসেরি জোসেফ জেসুদাস।

জেসুদাস এর গান এর প্রতিবেশী বাজনা ও বাহুল্যরা মন বসাতে পারে না কাজে, কেমন যেন ঝুম মেরে ভগবানের গলা শুনতে বসে মাটির মেঝেতে থুবড়ে নিজের কাজ ভুলে, ঠান্ডা শরীরে ভাবুক স্যাক্স শোনে "য়্যায় মেরে উদাস মন, চল দোনো কহিন দূর চলে, মেরে হামদম, তেরে মঞ্জিল ইয়ে নেহি ইয়ে নেহি কোই অওর হ্যায়"।

রাত বাড়লে ফেরবার রাস্তা পেরিয়ে যাবার পথে চাঁদ আবদার ধরে "চাঁদ আকেলা জায়ে সখী রে, মন মোরা ঘাবরায়ে রে" শুনবার, সে একটু ডুবতে দেরি হোক বরং একলাইন "ও বৈরাগী, ও মনভাওন, কব আয়েগা মোরে আঙন" এর মনকেমনের টানে।

ক্যালেন্ডার এর পাতা থেকে রাধামনি নেমে আসেন "কা করু সজনী, আয়ে না বালাম" এর অপেক্ষার পুজোর দু ফোঁটা চোখের জল ফেলতে। অন্ধ কৃষ্ণপুজো তো অনেক হল, ঐ ম্যাজিক গলার "ইয়ে জগ সারা, নিদ সে হারা, মোহে নিদ না আয়ি" স্তব, সে কি কম কাছের?

সব শেষে ইনসমনিয়ায় ভোগা দেবাদিদেব মুখ ঢেকে জেসুবাবুর কুটিরের পেছনের দরজা দিয়ে আসেন একে একে বাকিরা বিদায় নিলে। জেসুবাবু মুচকি হেসে তানপুরা তুলে গলায় মোলায়েম স্বর্গমাখা সুর তুলে নেন ঘুমপাড়ানিয়া অনুরোধে ...

"কোই গাতা ম্যায় শো যাতা" শুরু হয় অদ্ভুত মায়ার হাত বুলিয়ে গলার কাছে জমে থাকা বিষের জ্বালা ভুলিয়ে, "কোই মেরা শর গোদি মে রাখ সহলাতা, ম্যায় শো যাতা"র হাতপাখার মিঠে হাওয়ায় ঘুম নেমে আসে চোখে।

জেগে থাকেন, টিমটিম করে তারাদের সাথে আলো দিতে থাকেন কাট্টাসেরি জোসেফ জেসুদাস।

Sunday, May 20, 2018

বাফ ছেড়ে বোদ্ধা সাজার সহজ উপায় ১

2012 সালে সাইট এন্ড সাউন্ড পত্রিকা দুনিয়াভর এর স্বনামধন্য চিত্রপরিচালকদের নিয়ে বিশ্বের সর্বকালের সেরা চলচ্চিত্র বিষয়ে একটি সমীক্ষা করে। প্রথম স্থানে উঠে আসে একটি জাপানি সিনেমা যা প্রথম স্থানের দৌড়ে একেবারেই ছিল না। এমনকি একই সার্ভেতে ক্রিটিক্স বিভাগেও সেই একই সিনেমা, যার নাম 'টোকিও স্টোরি', তৃতীয় স্থান অধিকার করে।

ছবির সময়:1953
পরিচালক: ইয়াসুজিরো ওজু

এক বৃদ্ধ দম্পতি যাঁরা তার ছোট মেয়ের সাথে মফস্বলে থাকেন, তারা দেখা করতে আসেন তার ছেলে মেয়েদের সাথে প্রথমবার যুদ্ধোত্তর ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন এর পদধ্বনি ওয়ালা টোকিও শহরে। ছোটখাটো ডাক্তার বড় ছেলে, বিউটি পার্লার চালানো বড় মেয়ের সাথে থাকার সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ে শিগগিরই, যদিও তাতে তাদের স্ত্রী বা স্বামীর ভূমিকা কখনোই প্রধান হয় না। মেজ ছেলের বিধবা স্ত্রী একমাত্র ভরসা হয় অচেনা শহরে। বুড়ো এক রাত্রে কিছু পুরোনো টোকিওপ্রবাসী বন্ধুদের সাথে পানভোজন এর আধিক্যে করেন আত্মসমীক্ষন ও খানিকটা সমাজ এর মূল কাঠামোর বদলের পর্যালোচনা। ফিরে আসার পথে ওসাকা তে রেলচাকুরে ছোট ছেলেও খুব একটা আশা জাগায় না। বুড়ো বুড়ি ফিরে আসেন নিজের জায়গায়। বুড়ি মারা যান। ছেলে-মেয়েরা ব্যস্ত সময় থেকে একচিলতে সময় বার করে দায়িত্ব পালন করতে আসে। ফিরেও যায়। বুড়ো আর বিধবা বৌমা, বিধবা বৌমা ও ছোট মেয়ের কিছু সংলাপে ধরা থাকে আধুনিক সভ্যতা ও পরিবারের মধ্যের টানাপোড়েন গুলো।

বিয়ে না করে সারা জীবন মায়ের সাথে কাটানো পরিচালক (সূত্র: আই এম ডি বি) তার স্বভাববসতই হেলে থাকেন পুরনো পারিবারিক মূল্যবোধের দিকে, কিন্তু কখনই তিক্ততা আনেন না, বরঞ্চ বার বার জোর দেন আত্মসমীক্ষন বা বদলের অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে। স্থির, মাটি থেকে তিন হাত মাত্র ওপরের ক্যামেরায় নেয়া অধিকাংশ শট ছবিকে একটা সিগনেচার স্থিরতা আর গ্রাউন্ড রিয়ালিটিসংলগ্নতা দেয়। গোটা ছবি প্রশ্ন করতে থাকে বারবার একটা ধারণাকে, 'এ চাইল্ড কান্ট সার্ভ হিজ পেরেন্টস আফটার গ্রেভ'। উত্তরও আসে, তবে তা সাদা বা কালো হয় না, ধূসর এই ছবির আত্মা। মিনিমালিস্টিক, জাপানি কালচারের মতই এ ছবির বক্তব্য।

আই এম ডি বি ট্রিভিয়া বলছে, সত্যজিৎ রায় ছবিটি দেখতে দেখতে শেষের দিকে একটু ইমোশনাল হয়ে পড়েন। কতটা ঠিক জানা নেই, কারন, সত্যজিৎ বাবু নিজে অপরাজিত করার ভাবনা শুরু করেন মা মারা যাবার পর অপুর মনের চাপা খুশির বৈপরীত্বে ইন্টারেস্টেড হয়ে ('মাই ইয়ার্স উইথ অপু')। কিন্তু মনে হল টোকিও স্টোরি ছবির আত্মা জাপানি ছবি ভক্ত পরিচালকের 'শাখা প্রশাখা'তে ফিরে এসেছে একটু হলেও।

বুড়ি টোমির সাথে ছোট নাতির ঘাসের উপর খেলা, বিধবা মেজ বৌ এর তিক্ত দাম্পত্য স্মৃতি ও নতুন দুনিয়ার হাতছানি উপেক্ষা করে অভ্যাস এর গোলামী, সমুদ্রতীরে সৈকতাবাসে বুড়ো বুড়ির আত্মসমীক্ষন, বুড়ির মৃত্যূর পর ছেলেমেয়েদের ও বাবার মুখোমুখি সংলাপ, ছবির শেষ হওয়ার পরেও সামনে ভাসতে পারে।

কখনো সময় হলে, যা এই ছবির মধ্যবয়সী পাত্রপাত্রী বা আমাদের একেবারেই হয় না ঝুটো এবং ঠুনকো প্রায়রিটির জন্য, দেখে নেয়া যেতেই পারে।

Tuesday, May 15, 2018

দি ইকোনমিক টাইমস (রিপ্লাগ)

দু হাজার চার এ যখন টুম্পা আমি গ্রাফাইট ইন্ডিয়া লিমিটেড এ সার্টিফাইড কয়লা কুলির চাকরি ছেড়ে এমবিএ নামক তৎকালীন আলাদিন এর আশ্চর্য প্রদীপটি হাতাবার অপচেষ্টায় কলকাতা নামক 'বিশাল' শহরে আসি যথাক্রমে মফস্বল আমার মনের শহর মেদিনীপুর ও তৎপরবর্তী আরেক মফস্বল আমার নেমেসিস শহর দুর্গাপুর ছেড়ে, আমার শুভাকাঙ্খী কলিগ কাকু, যিনি এখন একটি নামী ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট, তিনি ভেঙে পড়া ভীত আমিকে পার্টিং উপদেশ ছুঁড়ে মারেন: "সার্থক, সবসময় মনে রাখবে দুনিয়াটা কিন্তু অনেক বড়", যা নিয়তির ডাকে বা কালসর্প দোষে বীভৎস রকম মনে ধরে আমার।

তৎকালীন ক্যামাক স্ট্রিট এ একটি এমবিএ এন্ট্রান্স টেস্ট কোচিং সেন্টার এ ভর্তি হই যা ছিল সম্ভবত বিদুর কাপুর নামে একজন আইআইএম য়্যালুমনির এন্ত্রেপ্রেনিউরল প্রতিষ্ঠান। এহেন হনু বিদুর বাবু, যিনি নামের মাহাত্মে প্রাচীন কালে ধৃতরাষ্ট্র থেকে সকলকেই ফ্রিতে জ্ঞান বিতরণ করে বিরক্ত ও তাড়না করে আসছেন, তার অত্যন্ত ঝকঝকে বহিরাঙ্গ এবং ততোধিক ফরফরে ইংরেজির কারণে প্ৰথম দিনই আমার মনে তুমুল তৃণমূল স্তরে মনোনয়নবিহীন প্রভাব বিস্তার করেন, যার কারণ মূলতঃ দুটি। এক, উনি আমার পূর্বোক্ত কাকুর বড় পৃথিবী দৈববানী পুনরাবৃত্তি করেন ও চাকরি ছেড়ে বাবার পয়সায় বাবুয়ানি করতে আসার পাপবোধকে বুর্জোয়া দক্ষতায় ধামাচাপা দেন। দুই, তার ইংরেজি ভাষাদক্ষতা ও বাচনশক্তি, যা বাংলামিডিয়ামাটাইটিস ও দেখমফতুইক্যাবলাকেমনাইটিস এ ভোগা রোগাভোগা আমাকে এ প্লাস গোত্রের বিজনেস স্কুলের জন্নতের দরজায় আইসিসজেহাদি টোকা মারার স্বপ্না্দ্য চুলকুনি উপহার দিতে সফল হয়।

সে যুগে চোখ বুজে আমি যেকোন লোককে ভক্তদের করা মুদিবাবুকে বিশ্বাস এর মত লালায়িত বিশ্বাস করতাম, যদি তিনি একটু চকচকে দেখতে ও ভাল ইংরেজি বলতে পারতেন।

তো এই বিদুরবাবুর চাকচিক্যের প্রভাবে আমি একটি যৌবনের কুঅভ্যাসে পড়ি প্রথমবার। দি ইকোনমিক টাইমস নামক পত্রিকার গ্রাহক হয়ে পড়ি। বিদুরবাবুর বাতবাজি আমায় কনভিন্স করে, যতদিন না কেউ এই মহান চোরদুনিয়ার মুখপত্র লিটিল ম্যাগাজিনটির পাতা না উল্টোবে, ব্যবসায়িক দুনিয়ার আঁতেলরা ততদিন তোমাকে সাপ্তাহিক বর্তমান এর মতই অচ্ছুৎ করে রাখবে।

আমি প্রথম দিন এই পত্রিকাটির চারপাতা পড়ি, দ্বিতীয়দিন দুপাতা, তৃতীয়দিন একপাতা, চতুর্থদিন এক কলম, পঞ্চমদিন একটি খবর, ষষ্ঠদিন থেকে দিলীপবাবুর মার্কশিট পাওয়ার মতন পড়া অর্থাৎ পড়া বন্ধ হয়। কিন্তু এই নিষিদ্ধ বস্তুটির লাল মার্কসীয় রঙ, বেচবার পরে মোটা দাম (সম্ভবত একটাকা প্রতি কেজি বেশি), আরো না জানি কি, এতটাই প্রভাব বিস্তার করে, নেশার ঘোরে আমি প্রতি মাসে ঐ নিষিদ্ধ জিনিস নিতে, জমা করতে ও বেচতে থাকি। সব খারাপেরই শেষ থাকে, একদিন এন্ট্রান্স এগজাম এর রেজাল্ট বেরোতে আমার মসজিদদৌড় বন্ধ হয় এবং আশার য়্যালকোহলসমাধি ঘটে। ধাক্কা পেয়ে প্রথম কাজ হিসেবে আমি এই সাবস্ক্রিপশন বন্ধ করি এবং আশ্চর্য্যজনক ভাবে একমাসের মধ্যে একটি নবরত্ন কোম্পানিতে ঠিকঠাক একটি চাকরি জোগাতে সক্ষম হই।

ঠিক এর চার বছর পরে, সেই পূর্বোক্ত কাকুর অমোঘ দার্শনিক বড় দুনিয়ার লাইন আমার বেওকুফ বোহেমিয়ানাকে আবার কামড়ে দেয়, এবং এমবিএ হওয়ার কামজ্বর এ পুনরাক্রান্ত হয়ে আমি চাকরি লাথি মেরে কোনমতে গড়ের মাঠের শহরের বুকে একটি ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড এ গড়পড়তা কিন্তু আমার ব্যক্তিগত যোগ্যতার গড়ের উপরের বিগ্রেড বি স্কুলে ভর্তি হই।

ফ্যাকাল্টি হিসেবে এক ভদ্রলোককে পাই যিনি প্রচন্ড দুর্মুখ এবং সকলকে অপমান করা সদর্পে জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আমার কর্পোরেট জগতের অভিজ্ঞতায় তখন আমি সেই লোকদেরই বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যারা প্রচন্ড অপমান করেন ও অপমানটাকে শিল্পের (চপ নয়) পর্যায়ে নিয়ে যান। সম্ভবত তারাপদবাবুর রচনায় পড়েছিলাম যে ডাক্তারবাবু যত দুর্মুখ তত বেশি তার পসার, এরকম এক পাগলের ডাক্তারবাবু তার রোগীদের প্রচন্ড অপমান করতেন ও প্রায় সুস্থ করে আনতেন ও শেষে একদিন অপমান করতে করতে কামড়ে দিতেন এবং রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি যেত। সেই 'তারা'বাজি থাক এখন। মোটের ওপর এই ভদ্রলোকের অপমানে মেসমারাইজড হয়ে ওর উপদেশানুসারে আমি আবার ইকোনমিক টাইমস নিতে এবং আবার না পড়তে শুরু করি।

দেড় বছর পরে, দু হাজার দশ নাগাদ, আমি হঠাৎ করে আবিষ্কার করি ইকোনমিক টাইমস এর নিষ্কলঙ্ক পাতার মতই যেকোন কারনে আমার চাকরির ভাঁড়ার শূন্য যেখানে প্রায় আধা ডিপার্টমেন্ট মোটের ওপর একটা করে চাকরি হাতের মুঠোয় নিয়েছে।

শোকাহত হয়ে, মাঝরাত্তিরে, একান্তে, তুমুল চানাচুরসহ জলপথে গভীর ইন্ট্রোস্পেকশনে বসে যখন আমি আমার এই চরম গঙ্গাপ্রাপ্তির পরিণতির গোমুখসন্ধানে ব্যস্ত, তখন চোখে পড়ে ঘরের কোনের ইকোনমিক টাইমস এর বোঝার দিকে। বিশ্বাস করবেন না, ঝপ করে মাথাটা কেমন যেন পরিষ্কার হয়ে যায়। সারারাত না ঘুমিয়ে ভোর পেরনোর পরে প্রথমে কাগজদাদার হাত থেকে আনন্দবাজারটা নিয়ে ইকোনমিক টাইমস টা নিতে বিপ্লবী অস্বীকার করি ও প্রথম যে বেসুরেলা কাগজওয়ালা পাই, তাকে ধরে এনে পুরনো সতীসাধ্বী কাগজগুলোকে বিদায় করি। সেই দেবদূত কাগজওয়ালা আমায় জীবনে প্রথম ও শেষ ব্যক্তি হিসেবে আমাকে জানায় যে আমার খুব যত্ন, ভাঁজ না খোলা ইকোনমিক টাইমস এর প্রভাব ও দিব্যি!

ভগবানের বা কার্ল মার্ক্স এর অশেষ দয়ায় এর এক-দু সপ্তাহের মধ্যেই কি ভাবে যেন একটি কাজ চালানো চাকরির জোগাড় হয়।

এই অকিঞ্চিতকর লেখার একটাই উদ্দেশ্য। কোন ছোট ভাইবোন যদি তাদের বেসিক নেসিসিটি গুলো ছুঁতে পাচ্ছে না শত চেষ্টা করেও, অথচ গ্রহের ফেরে পড়ে ফেলেছে এই প্রলাপরচনা, দেখুন না চোখ বুলিয়ে, ঘরের বা মনের এক কোনে কোন ইকোনমিক টাইমস এর জঞ্জাল জমিয়ে রাখেন নি তো?

বিদায় করুন।

ভালো থাকুন!